ব্রেকিং:
পুষ্প প্রভাত টিভিতে স্বাগতম। পুষ্প প্রভাত টিভি বাংলা নিউজ চ্যানেলে পাবেন: ব্রেকিং নিউজ, রাজ্য ও জাতীয় খবর, আন্তর্জাতিক ও ইসলামী দুনিয়ার খবর, শিক্ষা, খেলা ও বিনোদন, আলোচনা ও ময়দানি প্রতিবেদন, সরাসরি মাঠ পর্যায়ের প্রতিবেদন ও টক শো।সাবস্ক্রাইব করুন এবং বেল আইকন চাপুন – গুরুত্বপূর্ণ কোনও খবর যেন বাদ না যায়! আমাদের অফিসিয়াল সাইটে: https://puspaprovat.com/ Links. FACEBOOK PAGE PUSPA PROVAT www.facebook.com/puspaprovattv. INSTAGRAM www.instagram.com/puspaprovat. TWITTER www.twitter.com/puspaprovat. Puspa Provat (Bengali news) https://puspaprovat.com/ LINKEDIN linkedin.com/company/puspaprovat. YOUTUBE www.youtube.com/@PuspaProvattv মুর্শিদাবাদের ফরাক্কার বেওয়া-২ পঞ্চায়েতের নিশিন্দ্রা গ্রামে ভোটার তালিকা ভুয়ো ভোটার। জঙ্গিপুর পুলিশ জেলার উদ্যোগে মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের সংবর্ধনা সভা। ন্যাশনাল প্রেসিডেন্ট এমকে ফাইজির গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে সামশেরগঞ্জে পথসভা SDPI এর ফের সামশেরগঞ্জের হাউস নগর ১২ নম্বর জাতীয় সড়কে পথদুর্ঘটনা, অল্পের জন্য রক্ষা গাড়িচালকের জামাইবাবুর হাতে ধর্ষিতা নাবালিকা

শুক্রবার   ০৬ নভেম্বর ২০২৬   কার্তিক ২২ ১৪৩৩   ২০২৬৭ ২০২৬৩ ২০২৬১

সর্বশেষ:
পুষ্প প্রভাত টিভিতে স্বাগতম। পুষ্প প্রভাত টিভি বাংলা নিউজ চ্যানেলে পাবেন: ব্রেকিং নিউজ, রাজ্য ও জাতীয় খবর, আন্তর্জাতিক ও ইসলামী দুনিয়ার খবর, শিক্ষা, খেলা ও বিনোদন, আলোচনা ও ময়দানি প্রতিবেদন, সরাসরি মাঠ পর্যায়ের প্রতিবেদন ও টক শো।সাবস্ক্রাইব করুন এবং বেল আইকন চাপুন – গুরুত্বপূর্ণ কোনও খবর যেন বাদ না যায়! আমাদের অফিসিয়াল সাইটে: https://puspaprovat.com/ Links. FACEBOOK PAGE PUSPA PROVAT www.facebook.com/puspaprovattv. INSTAGRAM www.instagram.com/puspaprovat. TWITTER www.twitter.com/puspaprovat. Puspa Provat (Bengali news) https://puspaprovat.com/ LINKEDIN linkedin.com/company/puspaprovat. YOUTUBE www.youtube.com/@PuspaProvattv
ট্রাম্প ডিনার টিকিট ১ মিলিয়ন

ট্রাম্প ডিনার টিকিট ১ মিলিয়ন

০৯:৪৩ পিএম, ১২ জানুয়ারি ২০২৬ সোমবার

চিনের দাবি: মাদুরো ও স্ত্রীর তৎক্ষণাত মুক্তি দিন

চিনের দাবি: মাদুরো ও স্ত্রীর তৎক্ষণাত মুক্তি দিন

০৩:৩৪ পিএম, ৪ জানুয়ারি ২০২৬ রোববার

ঢাকায় ফিরলেন হাইকমিশনার

ঢাকায় ফিরলেন হাইকমিশনার

০৬:৩৩ পিএম, ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫ মঙ্গলবার

সিলেটে ভারতীয় উপদূতাবাসে কড়া প্রহরা

সিলেটে ভারতীয় উপদূতাবাসে কড়া প্রহরা

০১:৫৬ পিএম, ২১ ডিসেম্বর ২০২৫ রোববার

যুদ্ধবাজ ট্রাম্পের নীতিতে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের হাতছানি

যুদ্ধবাজ ট্রাম্পের নীতিতে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের হাতছানি

"যুদ্ধবাজ ট্রাম্পের নীতিতে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের হাতছানি "

ডক্টর মোঃ বদরুল আলম সোহাগ 

 

বিশ্ববাসীর আতঙ্ক ও উদ্বেগের মাঝেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছেন, ইরানের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনায় মার্কিন সামরিক বাহিনী বোমা হামলা চালিয়েছে। শনিবার (২২ জুলাই) ওয়াশিংটনের স্থানীয় সময় রাত আটটার কিছু আগে নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দেওয়া এক বার্তায় ট্রাম্প এই হামলার কথা জানান।

 

ট্রাম্প লিখেছেন, “আমরা ইরানের তিনটি পারমাণবিক স্থাপনায় সফলভাবে হামলা সম্পন্ন করেছি, যার মধ্যে রয়েছে ফর্দো, নাতাঞ্জ ও ইস্পাহান। সব উড়োজাহাজ এখন ইরানের আকাশসীমার বাইরে।”

 

এই ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অঙ্গনে চরম উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে। বিশ্লেষকদের মতে, এই হামলার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি মধ্যপ্রাচ্যের জটিল যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে, যার পরিণতি হতে পারে ভয়াবহ।

 

বিশ্বজুড়ে সমালোচনার ঝড়

 

ট্রাম্পের এই ঘোষণার পরপরই বিশ্বজুড়ে নেতৃবৃন্দ ও বিশ্লেষকরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। অনেকেই বলছেন, এই হামলা ছিল অপ্ররোচিত এবং আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, এটি গোটা মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা বাড়িয়ে দেবে এবং পরোক্ষে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের পথ প্রশস্ত করতে পারে।

 

সমালোচকদের মতে, ট্রাম্পের দীর্ঘদিনের ‘ইসরায়েল-পক্ষপাতমূলক’ অবস্থান এবং মধ্যপ্রাচ্যে আগ্রাসী নীতি বাস্তবায়নের প্রবণতাই এই সিদ্ধান্তের পেছনে কাজ করেছে। অনেকেই বলছেন, ইরানের বিরুদ্ধে ‘ভিত্তিহীন হুমকি’র দোহাই দিয়ে ট্রাম্প একতরফা হামলা চালিয়ে কেবল নিজের রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিল করছেন।

 

ট্রাম্পের মানসিক ভারসাম্য ও নেতৃত্ব প্রশ্নবিদ্ধঃ

 

বহু বিশ্লেষকই ট্রাম্পের মানসিক স্থিতি ও নেতৃত্বের যোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে বলেন, *“ট্রাম্পের এই ধরনের দায়িত্বজ্ঞানহীন সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকি।”*

 

মার্কিন রাজনীতিতে ট্রাম্প বহুদিন ধরেই বিভাজনের প্রতীক হয়ে উঠেছেন। নিজ দল রিপাবলিকানের অনেক সদস্যও তাঁর এই সিদ্ধান্তে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন।

 

**জাতিসংঘের জরুরি বৈঠক, শান্তির আহ্বান**

 

ইরানের পক্ষ থেকে হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে প্রতিশোধের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। জাতিসংঘ জরুরি বৈঠক আহ্বান করেছে এবং মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ এড়াতে শান্তিপূর্ণ আলোচনার আহ্বান জানিয়েছে।

 

বিশ্ব আজ এক উত্তাল ও অনিশ্চিত সময়ের মুখোমুখি। এমন সময়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এ ধরনের সিদ্ধান্তকে অনেকেই দেখছেন কেবল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, অপকৌশল এবং বিপজ্জনক এক জুয়া হিসেবে। মানবতা ও বিশ্বশান্তির স্বার্থে যুক্তরাষ্ট্রসহ সব পক্ষকে এখনই সংযম এবং কূটনৈতিক সমাধানের পথ বেছে নিতে হবে।

০৫:১১ পিএম, ২৩ জুন ২০২৫ সোমবার

NTPC Farakka Launches GEM-2025 to Empower 120 Girls from Bengal and Jharkhand

NTPC Farakka Launches GEM-2025 to Empower 120 Girls from Bengal and Jharkhand

০৫:৪১ এএম, ৩১ মে ২০২৫ শনিবার

শবেবরাত ২০২৫: অভিবাসন ও গাজা নিপীড়ন

শবেবরাত ২০২৫: অভিবাসন ও গাজা নিপীড়ন

শবেবরাত ২০২৫: অভিবাসন ও গাজা নিপীড়ন

খগেন্দ্রনাথ অধিকারী

 

বুৎপত্তিগতভাবে শবে বরাত কথাটি ফরাসী শব্দ "শব" এবং "বরাত" (অর্থাৎ রাত এবং সৌভাগ্য)--এই দুই-এর যোগফল। এক কথায় শবেবরাত শব্দের অর্থ হোল সৌভাগ্যের রাত। মুসলিম ভাইবোনদের কাছে তো বটেই, হিন্দু--মুসলিম--বৌদ্ধ--খৃশ্চান, জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে, সারা পৃথিবীর সকল ধর্মনিরপেক্ষ তথা বহুত্ববাদী মানুষদের কাছে এই দিনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং আবেগ জড়িত দিন: এই দিনটি হোল পরম শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের দিন। ধর্মপ্রাণ মুসলিম ভাইবোনেরা এই দিনটিতে প্রার্থনা করেন তাঁদের প্রয়াতঃ স্বজনদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে, প্রার্থনা করেন তাঁদের করা "গুনাহ" অর্থাৎ অন্যায় কাজের জন্য মার্জনা চেয়ে।

মনে রাখতে হবে যে প্রতিটি ধর্মীয় পার্বনের দুইটি দিক আছে। বস্তুবাদীরা মানেন না বটে, কিন্তু এটাই বাস্তব যে এই ধরণের অনুষ্ঠানের একাধারে আত্মিক (আধ্যাত্মিক) ও সামাজিক দিক আছে। কি খৃষ্টীয় পার্বন বড়দিন, কি হিন্দু পরব দ্বীপান্বিতা, কি মোমিন ভাইদের শবেবরাত, সব কিছুরই এই দুইটি দিক আছে। শবেবরাতের আত্মিক প্রসঙ্গ আগেই উল্লেখ করেছি। বড়দিনে খৃশ্চান ভাইবোনরা "মা মেরী" ও "লর্ড যীশু"-কে স্মরণ করে তাঁদের আশীর্বাদ চান। দীপান্বিতাতে হিন্দু ভাইবোনরা দীপ জ্বেলে পিতৃপুরুষের স্মরণ করেন এবং তাঁদের আশীর্বাদ চান। বলা বাহুল্য যে শবেবরাতের রাতে মুসলিম ভাইবোনদের মাজারে দীপ জ্বালানোর সাথে দীপাবলীর রাতে হিন্দু ভাইবোনদের বা বড়দিনের রাতে খৃশ্চান ভাইবোনদের আলোকসজ্জা করার গভীর মিল রয়েছে। 

এই আত্মিক মিলের পাশাপাশি এইসব পরবের একটি বিশাল সামাজিক তাৎপর্যও আছে। তথাকথিত আগ মার্গা বামপন্থী বা কমিউনিস্টরা এইসব পার্বনকে পাত্তাই দেন না। কার্লমার্কস্‌ তাঁর সময়কালে খৃশ্চান পাদ্রীরা জার্মানীসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে "মুক্তিপত্র" বিক্রিকরে যে ব্যবসা করতো এবং সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষরা "পাপের হাত থেকে রেহাই পেতে" যেভাবে টাকা দিয়ে সেগুলো কিনতো, তাই দেখে ক্ষুব্ধ কার্লমার্কস্‌ লিখেছিলেন "Religion is the opium of the masses" অর্থাৎ ধর্ম আফিঙ। কিন্তু এই ধর্মের যে একটা প্রচণ্ড সামাজিক দিকও আছে, সেটাও তিনি স্বীকার করেছেন এবং সেই জন্যই তিনি বিয়ে করেছিলেন চার্চে গিয়ে। বিয়ের সামাজিক দিক তথা এক্ষেত্রে চার্চের সামাজিক ভূমিকাকে তিনি অস্বীকার করতে পারেননি।

১৯১৭ সালে অক্টোবর বিপ্লবের পর বলশেভিক পার্টিতে তুমুল বিতর্ক ওঠে যে গীর্জা মসজিদ, মঠ মন্দির এইসব ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলি সম্পর্কে বলশেভিক সরকারের নীতি কি হবে। ট্রটস্কি প্রমুখ বাম হঠকারীরা মার্কসের উল্লিখিত উক্তির দোহাই পেড়ে সমস্ত ধর্মস্থানগুলিকে ভেঙ্গে দেবার উপরে তথা ধর্মীয় পর্বগুলি পালনের উপরে নিষেধাজ্ঞা জারির কথা বলেন। অন্য দিকে প্লেখানভ, পটারেসব প্রমুখ দক্ষিণপন্থী সংশোধনবাদীরা বলেন যে সমস্ত ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও ধর্মাচারণের তথা ধর্মীয় পার্বন পালনের সকল সুযোগকে বলশেভিক সরকার পূর্ণ সুযোগ দেবে। কমরেড লেনিন ও কমরেড যোসেফ স্টালিন এই উভয় বক্তব্যকেই খারিজ করে একটি তৃতীয় বিকল্পের কথা বলেন। সেটি ছিল এই যে কোনরকম ধর্মীয় মতান্ধতা ও কুসংস্কারকে তথা ধর্মীয় মৌলবাদকে বলশেভিক সরকার প্রশ্রয় দেবে না। তবে ধর্মাচরণের অধিকার তথা ধর্মীয় পরব পালনের অধিকারকে এই সরকার সম্মান করবে। আবার সেই সঙ্গে সঙ্গে ধর্মাচরণ না করার অধিকারকেও বলেশেভিক সরকার কুর্নিশ করবে।

বস্তুতঃপক্ষে লেনিন সংবিধান, স্টালিন সংবিধান ও ব্রেজনেভ সংবিধানে একইসঙ্গে এই দুই অধিকার স্বীকৃতিলাভ করে। সোভিয়েত ইউনিয়নের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে সেখানে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ক্ষুধা, দারিদ্র্যও বেকারী দূর হওয়ার ফলে শবেবরাত বা ঈদেলফেতরে ভিক্ষা বা দান নেবার মত কোন লোককে পাওয়া যেতো না। তাই সরকার রাষ্ট্রীয় ভাণ্ডার খুলে দিত দান বা ফেতরা গ্রহণের জন্য। সেই দান বা ফেতরার অর্থ দিয়ে সরকার জনসেবামূলক কাজ করতো।

যাই হোক আমরা এখানে ২০২৫ সালের শবেবরাতের প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনা করছি। প্রত্যেক বারের মতো এ বছরও এই পবিত্র দিনে মোমিন ভাই বোনেরা প্রার্থনা করবেন। কিন্তু এ বছরে তাঁদের প্রার্থনার একটা বিশেষ দিক রয়েছে এবং সেই দিকটি হোল গাজাসহ সারা বিশ্বে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের মদতে ইসরায়েলসহ তার উচ্ছিষ্টভোগীরা রক্তের বন্যায় ভাসিয়ে দিচ্ছে। তাই এই দানবদের শাস্তি হোক এবং জর্ডানের তীরে গাজার প্রান্তরে ধ্বংসস্তূপের উপর সৃষ্টির কিশলয় পল্লবিত হোক, এটাই হবে প্রার্থনা। 

সমাজতান্ত্রিক-অসাজতান্ত্রিক নির্বিশেষে বিশ্বের সকল দেশের ধর্মপ্রাণ মুসলিম ভাইবোনেরা এবং সেই সঙ্গে ধর্মনিরপেক্ষ সমস্ত স্তরের মানুষরা সুস্থ সুন্দর বিশ্বের স্বপক্ষে এবং দানবীয় শক্তির বিনাশের জন্য প্রার্থনা করেন। এখানে প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য যে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ বারে বারে তার কায়েমী স্বার্থে মুসলিম দুনিয়াকে এই বলে বিভ্রান্ত করেছে বা করার চেষ্টা করেছে যে বামপন্থীরা ধর্ম মানে না বা ধর্মীয় পরবকে মান্যতে দেয় না। এই বলে তুরস্ক সংকটকালে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের অব্যবহিত পরে আমেরিকার রাষ্ট্রপতি ট্রুম্যানের মদতে হাজার হাজার বামপন্থী মুসলিম, মৌলবাদীদের হাতে খুন হয়েছেন। 

প্রায় সমসাময়িককালে মিশরের রাষ্ট্রপতি আব্দেল নাসেরকে বামপন্থীদের বিশেষ করে সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়নের বন্ধু হবার জন্য, মুসলিম ব্রাদরহুড নামে একটি মৌলবাদী মুসলিম সংগঠন মার্কিন মদতে খুন করার চেষ্টা করে। অভিযোগ তাঁর বিরুদ্ধে যে তিনি সাচ্চা মুসলিম নন। অথচ জাতিধর্ম নির্বিশেষে বিশ্বের সকল প্রান্তের নিপীড়িত জনতার পাশে থেকেছেন নাসের সাম্রাজ্যবাদীদের বিরুদ্ধে। তুরস্কের কমিউনিস্টরা জননেতা ও কবি নাজিম হিকমতের নেতৃত্বে ধর্মীয় মৌলবাদের বিরুদ্ধে লড়েছেন এবং ইসলামের মধ্য যে মানবতাবাদের নির্যাস রয়েছে, সেটিকে তুলে ধরেছেন। ইসলামী সংস্কৃতি তথা পার্বনগুলির সুস্থ-সুন্দর সম্প্রীতিবাদী দিকগুলির উপর জোর দিয়েছেন। 

বিগতশতাব্দীর সত্তরের দশকের শেষভাগে আফগানিস্থানে যে সাউর বিপ্লব হয়, তার কর্ণধাররা, বিশেষতঃ বারবাক কারমাল ও ডঃ নজিবুল্লাহ ধর্মীয় মতান্ধতার বিরুদ্ধে লড়েছেন। তাঁরা ইসলাম ও ইসলামী পরবের যে মানবতাবাদী মহান মুখ, তা তুলে ধরেছেন সমাজতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার মাধ্যমে। অথচ আমেরিকা সেখানকার প্রতিবপ্লবী শক্তিগুলিকে মদত করে রক্তের বন্যায় কাবুলকে ভাসিয়ে দিয়েছে, রাষ্ট্রপতি ডঃ নজিবুল্লাকে নিষ্ঠুরভাবে খুন করিয়েছে। আবার যে লাদেনকে সৃষ্টি করে সে আফগানিস্থানে এই তাণ্ডব করেছে, সেই লাদেনকেই সে খুন করেছে পাকিস্থানে বিমান হানা করে।

পরিশেষে, মুখে আমেরিকা ধর্ম ধর্ম বলে, কমিউনিস্ট ও বামপন্থীদের নাস্তিক বলে। অথচ পবিত্র ঈদের ভোরে এই আমেরিকা ইরাকী প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনকে ফাঁসি দিয়েছে এবং তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদে মুখর হয়েছে বামপন্থী ও কমিউনিস্টরা।

পরিশেষে বলতে চাই যে মার্কিনযুক্ত রাষ্ট্রে দ্বিতীয়বারের জন্য ডোনাল্ড ট্রাম্প রাষ্ট্রপতি হিসাবে নিযুক্ত হবার পর হোয়াইট হাউসের বর্বরতা আরও বেড়েছে। হিংস্র পশুর চেহারা নিয়ে সে ভারত, মেক্সিকো, কলম্বিয়া সহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অভিবাসীদের বিতাড়ন করছে। গাজা থেকে সমস্ত মুসলিম ভাইবোনদেরকে উৎখাত করার জন্য সে তেল আবিভকে প্রকাশ্যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এইসব দানবীয়তা ধ্বংস হোক এবং সত্য, ন্যায় ও মানবিক মূল্যবোধের জয় হোক, এটাই হবে এই ২০২৫ এর শবেবরাতের প্রার্থনা। 

 

      

লেখক পরিচিতি

অধ্যাপক খগেন্দ্রনাথ অধিকারী রাষ্ট্রীয় বিদ্যাসরস্বতী পুরস্কার ও এশিয়া প্যাসিফিক পুরস্কার সহ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বহু পুরস্কার প্রাপ্ত একজন খ্যাতনামা শিক্ষাবিদ। ইনি কোলকাতার সাউথ সিটি (দিবা) কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ।

ঠিকানা-শরনিয়ার বাগান

পোষ্ট-টাকী, পিন-৭৪৩৪২৯

পশ্চিমবঙ্গ, ভারত

 

*লেখকের কাছ থেকে মোঃ ইজাজ আহামেদ - এর দ্বারা সংগ্রহ করা হয়েছে*

০৯:৫৭ এএম, ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ রোববার

শবেবরাত ২০২৫: অভিবাসন ও গাজা নিপীড়ন

শবেবরাত ২০২৫: অভিবাসন ও গাজা নিপীড়ন

শবেবরাত ২০২৫: অভিবাসন ও গাজা নিপীড়ন

খগেন্দ্রনাথ অধিকারী

 

বুৎপত্তিগতভাবে শবে বরাত কথাটি ফরাসী শব্দ "শব" এবং "বরাত" (অর্থাৎ রাত এবং সৌভাগ্য)--এই দুই-এর যোগফল। এক কথায় শবেবরাত শব্দের অর্থ হোল সৌভাগ্যের রাত। মুসলিম ভাইবোনদের কাছে তো বটেই, হিন্দু--মুসলিম--বৌদ্ধ--খৃশ্চান, জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে, সারা পৃথিবীর সকল ধর্মনিরপেক্ষ তথা বহুত্ববাদী মানুষদের কাছে এই দিনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং আবেগ জড়িত দিন: এই দিনটি হোল পরম শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের দিন। ধর্মপ্রাণ মুসলিম ভাইবোনেরা এই দিনটিতে প্রার্থনা করেন তাঁদের প্রয়াতঃ স্বজনদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে, প্রার্থনা করেন তাঁদের করা "গুনাহ" অর্থাৎ অন্যায় কাজের জন্য মার্জনা চেয়ে।

মনে রাখতে হবে যে প্রতিটি ধর্মীয় পার্বনের দুইটি দিক আছে। বস্তুবাদীরা মানেন না বটে, কিন্তু এটাই বাস্তব যে এই ধরণের অনুষ্ঠানের একাধারে আত্মিক (আধ্যাত্মিক) ও সামাজিক দিক আছে। কি খৃষ্টীয় পার্বন বড়দিন, কি হিন্দু পরব দ্বীপান্বিতা, কি মোমিন ভাইদের শবেবরাত, সব কিছুরই এই দুইটি দিক আছে। শবেবরাতের আত্মিক প্রসঙ্গ আগেই উল্লেখ করেছি। বড়দিনে খৃশ্চান ভাইবোনরা "মা মেরী" ও "লর্ড যীশু"-কে স্মরণ করে তাঁদের আশীর্বাদ চান। দীপান্বিতাতে হিন্দু ভাইবোনরা দীপ জ্বেলে পিতৃপুরুষের স্মরণ করেন এবং তাঁদের আশীর্বাদ চান। বলা বাহুল্য যে শবেবরাতের রাতে মুসলিম ভাইবোনদের মাজারে দীপ জ্বালানোর সাথে দীপাবলীর রাতে হিন্দু ভাইবোনদের বা বড়দিনের রাতে খৃশ্চান ভাইবোনদের আলোকসজ্জা করার গভীর মিল রয়েছে। 

এই আত্মিক মিলের পাশাপাশি এইসব পরবের একটি বিশাল সামাজিক তাৎপর্যও আছে। তথাকথিত আগ মার্গা বামপন্থী বা কমিউনিস্টরা এইসব পার্বনকে পাত্তাই দেন না। কার্লমার্কস্‌ তাঁর সময়কালে খৃশ্চান পাদ্রীরা জার্মানীসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে "মুক্তিপত্র" বিক্রিকরে যে ব্যবসা করতো এবং সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষরা "পাপের হাত থেকে রেহাই পেতে" যেভাবে টাকা দিয়ে সেগুলো কিনতো, তাই দেখে ক্ষুব্ধ কার্লমার্কস্‌ লিখেছিলেন "Religion is the opium of the masses" অর্থাৎ ধর্ম আফিঙ। কিন্তু এই ধর্মের যে একটা প্রচণ্ড সামাজিক দিকও আছে, সেটাও তিনি স্বীকার করেছেন এবং সেই জন্যই তিনি বিয়ে করেছিলেন চার্চে গিয়ে। বিয়ের সামাজিক দিক তথা এক্ষেত্রে চার্চের সামাজিক ভূমিকাকে তিনি অস্বীকার করতে পারেননি।

১৯১৭ সালে অক্টোবর বিপ্লবের পর বলশেভিক পার্টিতে তুমুল বিতর্ক ওঠে যে গীর্জা মসজিদ, মঠ মন্দির এইসব ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলি সম্পর্কে বলশেভিক সরকারের নীতি কি হবে। ট্রটস্কি প্রমুখ বাম হঠকারীরা মার্কসের উল্লিখিত উক্তির দোহাই পেড়ে সমস্ত ধর্মস্থানগুলিকে ভেঙ্গে দেবার উপরে তথা ধর্মীয় পর্বগুলি পালনের উপরে নিষেধাজ্ঞা জারির কথা বলেন। অন্য দিকে প্লেখানভ, পটারেসব প্রমুখ দক্ষিণপন্থী সংশোধনবাদীরা বলেন যে সমস্ত ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও ধর্মাচারণের তথা ধর্মীয় পার্বন পালনের সকল সুযোগকে বলশেভিক সরকার পূর্ণ সুযোগ দেবে। কমরেড লেনিন ও কমরেড যোসেফ স্টালিন এই উভয় বক্তব্যকেই খারিজ করে একটি তৃতীয় বিকল্পের কথা বলেন। সেটি ছিল এই যে কোনরকম ধর্মীয় মতান্ধতা ও কুসংস্কারকে তথা ধর্মীয় মৌলবাদকে বলশেভিক সরকার প্রশ্রয় দেবে না। তবে ধর্মাচরণের অধিকার তথা ধর্মীয় পরব পালনের অধিকারকে এই সরকার সম্মান করবে। আবার সেই সঙ্গে সঙ্গে ধর্মাচরণ না করার অধিকারকেও বলেশেভিক সরকার কুর্নিশ করবে।

বস্তুতঃপক্ষে লেনিন সংবিধান, স্টালিন সংবিধান ও ব্রেজনেভ সংবিধানে একইসঙ্গে এই দুই অধিকার স্বীকৃতিলাভ করে। সোভিয়েত ইউনিয়নের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে সেখানে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ক্ষুধা, দারিদ্র্যও বেকারী দূর হওয়ার ফলে শবেবরাত বা ঈদেলফেতরে ভিক্ষা বা দান নেবার মত কোন লোককে পাওয়া যেতো না। তাই সরকার রাষ্ট্রীয় ভাণ্ডার খুলে দিত দান বা ফেতরা গ্রহণের জন্য। সেই দান বা ফেতরার অর্থ দিয়ে সরকার জনসেবামূলক কাজ করতো।

যাই হোক আমরা এখানে ২০২৫ সালের শবেবরাতের প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনা করছি। প্রত্যেক বারের মতো এ বছরও এই পবিত্র দিনে মোমিন ভাই বোনেরা প্রার্থনা করবেন। কিন্তু এ বছরে তাঁদের প্রার্থনার একটা বিশেষ দিক রয়েছে এবং সেই দিকটি হোল গাজাসহ সারা বিশ্বে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের মদতে ইসরায়েলসহ তার উচ্ছিষ্টভোগীরা রক্তের বন্যায় ভাসিয়ে দিচ্ছে। তাই এই দানবদের শাস্তি হোক এবং জর্ডানের তীরে গাজার প্রান্তরে ধ্বংসস্তূপের উপর সৃষ্টির কিশলয় পল্লবিত হোক, এটাই হবে প্রার্থনা। 

সমাজতান্ত্রিক-অসাজতান্ত্রিক নির্বিশেষে বিশ্বের সকল দেশের ধর্মপ্রাণ মুসলিম ভাইবোনেরা এবং সেই সঙ্গে ধর্মনিরপেক্ষ সমস্ত স্তরের মানুষরা সুস্থ সুন্দর বিশ্বের স্বপক্ষে এবং দানবীয় শক্তির বিনাশের জন্য প্রার্থনা করেন। এখানে প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য যে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ বারে বারে তার কায়েমী স্বার্থে মুসলিম দুনিয়াকে এই বলে বিভ্রান্ত করেছে বা করার চেষ্টা করেছে যে বামপন্থীরা ধর্ম মানে না বা ধর্মীয় পরবকে মান্যতে দেয় না। এই বলে তুরস্ক সংকটকালে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের অব্যবহিত পরে আমেরিকার রাষ্ট্রপতি ট্রুম্যানের মদতে হাজার হাজার বামপন্থী মুসলিম, মৌলবাদীদের হাতে খুন হয়েছেন। 

প্রায় সমসাময়িককালে মিশরের রাষ্ট্রপতি আব্দেল নাসেরকে বামপন্থীদের বিশেষ করে সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়নের বন্ধু হবার জন্য, মুসলিম ব্রাদরহুড নামে একটি মৌলবাদী মুসলিম সংগঠন মার্কিন মদতে খুন করার চেষ্টা করে। অভিযোগ তাঁর বিরুদ্ধে যে তিনি সাচ্চা মুসলিম নন। অথচ জাতিধর্ম নির্বিশেষে বিশ্বের সকল প্রান্তের নিপীড়িত জনতার পাশে থেকেছেন নাসের সাম্রাজ্যবাদীদের বিরুদ্ধে। তুরস্কের কমিউনিস্টরা জননেতা ও কবি নাজিম হিকমতের নেতৃত্বে ধর্মীয় মৌলবাদের বিরুদ্ধে লড়েছেন এবং ইসলামের মধ্য যে মানবতাবাদের নির্যাস রয়েছে, সেটিকে তুলে ধরেছেন। ইসলামী সংস্কৃতি তথা পার্বনগুলির সুস্থ-সুন্দর সম্প্রীতিবাদী দিকগুলির উপর জোর দিয়েছেন। 

বিগতশতাব্দীর সত্তরের দশকের শেষভাগে আফগানিস্থানে যে সাউর বিপ্লব হয়, তার কর্ণধাররা, বিশেষতঃ বারবাক কারমাল ও ডঃ নজিবুল্লাহ ধর্মীয় মতান্ধতার বিরুদ্ধে লড়েছেন। তাঁরা ইসলাম ও ইসলামী পরবের যে মানবতাবাদী মহান মুখ, তা তুলে ধরেছেন সমাজতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার মাধ্যমে। অথচ আমেরিকা সেখানকার প্রতিবপ্লবী শক্তিগুলিকে মদত করে রক্তের বন্যায় কাবুলকে ভাসিয়ে দিয়েছে, রাষ্ট্রপতি ডঃ নজিবুল্লাকে নিষ্ঠুরভাবে খুন করিয়েছে। আবার যে লাদেনকে সৃষ্টি করে সে আফগানিস্থানে এই তাণ্ডব করেছে, সেই লাদেনকেই সে খুন করেছে পাকিস্থানে বিমান হানা করে।

পরিশেষে, মুখে আমেরিকা ধর্ম ধর্ম বলে, কমিউনিস্ট ও বামপন্থীদের নাস্তিক বলে। অথচ পবিত্র ঈদের ভোরে এই আমেরিকা ইরাকী প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনকে ফাঁসি দিয়েছে এবং তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদে মুখর হয়েছে বামপন্থী ও কমিউনিস্টরা।

পরিশেষে বলতে চাই যে মার্কিনযুক্ত রাষ্ট্রে দ্বিতীয়বারের জন্য ডোনাল্ড ট্রাম্প রাষ্ট্রপতি হিসাবে নিযুক্ত হবার পর হোয়াইট হাউসের বর্বরতা আরও বেড়েছে। হিংস্র পশুর চেহারা নিয়ে সে ভারত, মেক্সিকো, কলম্বিয়া সহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অভিবাসীদের বিতাড়ন করছে। গাজা থেকে সমস্ত মুসলিম ভাইবোনদেরকে উৎখাত করার জন্য সে তেল আবিভকে প্রকাশ্যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এইসব দানবীয়তা ধ্বংস হোক এবং সত্য, ন্যায় ও মানবিক মূল্যবোধের জয় হোক, এটাই হবে এই ২০২৫ এর শবেবরাতের প্রার্থনা। 

 

      

লেখক পরিচিতি

অধ্যাপক খগেন্দ্রনাথ অধিকারী রাষ্ট্রীয় বিদ্যাসরস্বতী পুরস্কার ও এশিয়া প্যাসিফিক পুরস্কার সহ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বহু পুরস্কার প্রাপ্ত একজন খ্যাতনামা শিক্ষাবিদ। ইনি কোলকাতার সাউথ সিটি (দিবা) কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ।

ঠিকানা-শরনিয়ার বাগান

পোষ্ট-টাকী, পিন-৭৪৩৪২৯

পশ্চিমবঙ্গ, ভারত

 

*লেখকের কাছ থেকে মোঃ ইজাজ আহামেদ - এর দ্বারা সংগ্রহ করা হয়েছে*

০৯:৫৭ এএম, ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ রোববার

মেরিকার অর্থ  মন্ত্রকের সিস্টেমে চিনা হ্যাকার হানা

মেরিকার অর্থ মন্ত্রকের সিস্টেমে চিনা হ্যাকার হানা

১২:৫৪ পিএম, ৩১ ডিসেম্বর ২০২৪ মঙ্গলবার

৬ই ডিসেম্বর: ২০২৪-এর ডাক

৬ই ডিসেম্বর: ২০২৪-এর ডাক

০১:০৩ পিএম, ৬ ডিসেম্বর ২০২৪ শুক্রবার

ফাতেহা দোয়াজ  দাহাম ও ফাতেহা ইয়াজ দাহামের  দিনে  বিশ্ব মানবতার উত্তোরণে হোক দোয়া

ফাতেহা দোয়াজ দাহাম ও ফাতেহা ইয়াজ দাহামের দিনে বিশ্ব মানবতার উত্তোরণে হোক দোয়া

ফাতেহা দোয়াজ দাহাম ও ফাতেহা ইয়াজ দাহামের দিনে বিশ্ব মানবতার উত্তোরণে হোক দোয়া 

 

খগেন্দ্রনাথ অধিকারী

 

 আরবিতে ফতেহা শব্দের অর্থ হোল প্রার্থনা বা দোয়া। আর দোয়াজ দাহাম শব্দের অর্থ একসাথে বারোর প্রার্থনা। মহানবি হজরত মহম্মদের জন্মদিন হিসাবে এই দিবসটি পালন করা হয়। উল্লেখ্য যে ইসলাম ধর্মে জন্মদিন বা মৃত্যুদিনকে আড়ম্বর সহকারে পালনের বিধান নেই। অত্যন্ত অনাড়ম্বরভাবে মহানবির এই জন্মদিনটিকে বিশেষ প্রার্থনা, দোয়ার মাধ্যমে তাই উদ্‌যাপন করা হয়। ইংরাজী ৫৭০ মতান্তরে ৫৭১ খৃষ্টাব্দে মা ফতেমার গর্ভ থেকে মহানবি মক্কার এক পাহাড়ী উপত্যকায় জন্মগ্রহণ করেন। আসলে আরবি মাস "রবিউল আউয়াল"-এর ১২ তারিখে সোমবার হজরত মহম্মদ জন্মগ্রহণ করেন। তাই এই দিনের প্রার্থনাকে বারোর প্রার্থনা বা "ফতেহা দোয়াজ দাহাম" বলা হয়।

আর একটি কথা। "রবিউল" শব্দের আরবিতে অর্থ হোল বসন্ত বা চিরসবুজ। ইসলামী বিশেষজ্ঞরা বলেন যে মক্কাসহ গোটা আরব ভূখণ্ড ছিল মরুময়। কিন্তু মা ফতেমার গর্ভে মহানবি আসার সময় থেকে গোটা প্রাকৃতিক পরিবেশ সেখানে পাল্টে যায়। সবুজে সবুজে গোটা এলাকা ভরে যায়। গাছে গাছে দেখা দেয় রকমারী ফুল ও ফলের সমারোহ। মহানবির পবিত্র জন্মদিনে তাই বিশ্বজুড়ে ধর্মপ্রাণ মুসলিম ভাই বোনরা সর্ব্বশক্তিমানের কাছে দোয়া করেন, প্রার্থনা করেন বিশ্ববাসীর সুখ--শান্তি সমৃদ্ধির জন্য, ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত এক পৃথিবীর জন্য। এবারেও, এই ২০২৪ সালেও, ফতেহা দোয়াজ দাহামে তার কোনই অন্যথা হবে না। 

অনেকেই ফতেহা দোয়াজ দাহাম ও ফতেহা ইয়াজ দাহাম এই দুইটিকে এক করে ফেলেন।ইয়াজ দাহাম কিন্তু ফরাসী শব্দ ।এর অর্থ হলো এগারোতম দিন ।এটি হোল হজরত কাদের জিলানির ওফাত দিবস।হিজরি পাঁচশ একষট্টি সালের এগারোই রবিউস সানি ওনার এন্তেকাল হয়।তাঁর স্মরণে বিশ্বজুড়ে এইদিন প্রার্থনা করেন শান্তি ও সম্প্রীতির জন্য ।পনেরোই অক্টোবর দুহাজার চব্বিশে এবারে সেই ফতেহা ইয়াজ দাহামের দিন।আর দুহাজার চব্বিশ সালের ষোলই সেপ্টেম্বর ছিল ফতেহা দোয়াজ দাহামের দিন।

আমরা জানি যে আমরা আজ এই একবিংশ শতাব্দীতে, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিদ্যার বিস্ময়কর বিজয় যাত্রার যুগে বসবাস করছি। তবুও আমরা বোলবো যে মহানবি হজরত মহম্মদের ৫৭০/৫৭১ খৃষ্টাব্দে জন্মের পূর্ববর্তী সময়কাল ও আজকের যুগের তুলনামূলক বিচারে

কিম্বা পরমপূজ্য হজরত কাদের জিলানির পাঁচশ একষট্টি হিজরিতে ওফাত দিবসের বিচারে, ক্ষুধা--দারিদ্র্য--বেকারী--হানাহানি, ইত্যাদির দৃষ্টিকোণে, আমরা এখন মোটেও কোন ভালো অবস্থায় নেই। বরং বলা যায় যে আমরা বাহ্যিক দৃষ্টিতে অনেক উন্নততর অবস্থানে থাকলেও, আজো আমরা কার্যতঃ পড়ে আছি প্রাক--মহানবি--জন্মকালের আগের পরিস্থিতির মধ্যে। কি আমাদের রাজ্যপরিস্থিতি, কি আমাদের জাতীয় পরিস্থিতি, কি আমাদের বিশ্বপরিস্থিতি, সব কিছুর নিরীখে আমরা এই কথাই বলতে পারি।

প্রথমেই আমরা ধরি আমাদের রাজ্য পশ্চিমবাংলার অবস্থার কথা। আমাদের কবি দ্বিজেন্দ্রলাল রায় লিখেছিলেন--

"ধনধান্যে পুষ্পে ভরা,

আমাদের এই বসুন্ধরা।"

কিন্তু সেই "ধনধান্যে পুষ্পে ভরা বসুন্ধরা" আজ শশ্মানে পরিণত হয়েছে। কৃষি--শিল্প সমস্ত কিছুই আজ শেষ। বেকারীর পাহাড় এই রাজ্যে। হাজারো রকমের "ডোল" দেওয়ার ব্যবস্থা হয়েছে অমূক শ্রী তমুক শ্রী ইত্যাদির নামে। সীমাহীন দুর্নীতি ও দুর্বৃত্তায়ণ আজ এই রাজ্যে। দুর্বৃত্তদের হাতে মানুষ মরছে প্রতিদিন নির্বিচারে। দুর্নীতি জেনে ফেলেছিল বলেই আর. জি. কর মেডিক্যাল কলেজের তরুণী চিকিৎসককে খুন হতে হয়েছে। আজও তার কিনারা হয়নি। সরকারের প্রচার মাধ্যমে দুবেলা বলা হচ্ছে উন্নয়ন, উন্নয়ন। আমাদের জানতে ইচ্ছা করে এই উন্নয়ন কার উন্নয়ন? এই উন্নয়ন কি রিজওয়ানুয়ের বাবার উন্নয়ন? এই উন্নয়ন কি হরিয়ানার গোরক্ষকদের হাতে নিহত পশ্চিমবাংলার পরিযায়ী শ্রমিক সাবিরের পরিবারের উন্নয়ন? এই উন্নয়ন কি সিঙ্গুরে জমিহারা কৃষকদের উন্নয়ন অথবা যে তরুণরা রাজ্যে শিল্পায়ণের মাধ্যমে তাদের কর্মসংস্থানের স্বপ্ন দেখেছিল, এ উন্নয়ন কি তাদের উন্নয়ন? মোটেও তা নয়। এই উন্নয়ন হোল কিছু গোরু চোর, কয়লা চোর, বালি চোর, সোনা চোর, চাকরি চোর, মেছোঘেরীর মালিক, ইটভাঁটার মালিক, প্রোমোটার ও কনট্রাকটরদের উন্নয়ন। তারা রাতারাতি আঙ্গুল ফুলে কলা গাছ হচ্ছে। আর সাধারণ মানুষ দিন দিন আরও নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে। শাসকগোষ্ঠী কখনো সংখ্যালঘু তোষণ, কখনো সংখ্যাগুরু তোষণের মাধ্যমে হিন্দু--মুসলিমে বিভাজন তৈরী করে রাজ্যে ক্ষমতায় আছে। তাদের পুতনা রাক্ষসী রাজে কর্মহীন মানুষরা এরাজ্য ছেড়ে রুটি রুজির সন্ধানে ভিন রাজ্যে যাচ্ছে। সেখানে গিয়ে অপুষ্টি, অর্ধাহার, অস্বাস্থ্যকর কাজের পরিবেশ, ইত্যাদিতে কঠিন রোগে আক্রান্ত হয়ে কেউ কেউ মারা যাচ্ছে অকালে। আবার কেউ কেউ উগ্র ধর্মীয় মৌলবাদীদের আক্রমণের শিকার হয়ে লাশ হয়ে ফিরে আসছে শ্মশান শয্যায় বা গোরস্থানে। 

তাই এবারে ফতেহা ইয়াজ দাহামে বা দোয়াজ দাহামে মোমিন ভাইদের প্রার্থনা হবে পশ্চিমবাংলা যেন ধাপ্পাবাজি "লক্ষ্মীরভাণ্ডার"-এ পরিণত না হয়ে সত্যিকারের লক্ষ্মীর ভাণ্ডারে পরিণত হয়। যেন কৃষি, শিল্প, সামাজিক পরিবেশ সব কিছুতেই এই রাজ্যে মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরী হয় এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির প্রকৃত বাতাবরণের আবহে যেন কবিগুরুর পদধূলি ধন্য বাংলা "সোনার বাংলা"য় পরিণত হয়। সমৃদ্ধিতে পশ্চিমবাংলা আগামী দিনে ভরে উঠুক, এটাই হোক এই দুই দিবসের আবেদন ।

ঠিক একইভাবে এই পবিত্র দিনদুইটিতে সর্ব্বশক্তিমানের কাছে তাঁদের প্রার্থনা হোক ভারতের স্থিতি, স্থায়িত্ব, ও সমৃদ্ধি নিয়ে। ইতিহাস সাক্ষ্যদেয় যে আমাদের এই মহানদেশ একা হিন্দুর নয়, একা মুসলমানের নয়, একা খৃষ্টানের নয়, এই দেশ হোল হিন্দু--মুসলিম--বৌদ্ধ--খৃষ্টান সকলের। বহুত্ববাদী সংস্কৃতির যে ধারা অশোক--আকবর--দারাশিকো--বিবেকানন্দ--রবীন্দ্রনাথ--কাজী নজরুল প্রমুখের হাতে সমৃদ্ধ হয়েছে, সেই ধারা আজ আমাদের দেশে বিপন্ন। আমাদের দেশে আজ চলছে ধর্মীয় মেরুকরণের রাজনীতি। ফলে এদেশে আজ মানুষ গৌণ। মুখ্য হোল তার ধর্মীয় পরিচয়। কোথাও এখন এই আসমুদ্রহিমাচল ভারতবর্ষের কোথাও কোথাও একজন মানুষের জীবনের চেয়ে একটি গোরুর মূল্য অনেক বেশী। কোথাও রামের নামে, কোথাও রহিমের নামে হচ্ছে নির্মম নিষ্ঠুর গণহত্যা। আমাদের জন্মভূমি ভারতবর্ষ এই গভীর সংকটের হাত থেকে মুক্ত হোক এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির পরিমণ্ডল পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হোক, এটাই হোক সকল মোমিনের দোয়া। 

আমাদের দেশ ঐতিহ্যগতভাবে বরাবর সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী, বর্ণ বৈষম্যবাদ বিরোধী ও ঔপনিবেশিকতাবাদ বিরোধী। কিন্তু সেই মহান আদর্শ থেকে বিচ্যূত হয়ে আমাদের দেশের বর্তমান সরকার এখন সাম্রাজ্যবাদীদের তাঁবেদারে পরিণত হয়েছে। এদেশের শুভবুদ্ধি সম্পন্ন সকল মানুষ জাতিধর্ম নির্বিশেষে ভারত সরকারের এই লেজুড়বৃত্তির বিরুদ্ধে লড়ছেন। তাঁদের এই লড়াই যেন সফল হয় এবং এই লড়াই-এর চাপে যেন বর্তমান দিল্লীর সরকার বিদেশনীতির ক্ষেত্রে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী অবস্থান নিতে বাধ্য হয়, এটা হোক সকলের ঐ দিন দুইটিতে নমাজের শেষে মোনাজাত। 

পরিশেষে, আমাদের রাজ্য ও আমাদের দেশের মত গোটা বিশ্ব পরিস্থিতিও আজ খুব জটিল। সাম্রাজ্যবাদ ও সংকীর্ণ ধর্মীয় মৌলবাদ আজ রক্তের বন্যায় গোটা পৃথিবীকে আজ রক্তের বন্যায় ভাসিয়ে দিচ্ছে। কোথাও হিন্দু মৌলবাদ, কোথাও বৌদ্ধ মৌলবাদ, কোথাও খৃষ্টান মৌলবাদ, কোথাও ইহুদি মৌলবাদ ধর্মের দোহাই পেড়ে এই কাণ্ড করছে। মায়ানমারে বৌদ্ধ মৌলবাদীরা মুসলিম হবার অপরাধে রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুদের রক্তে সেদেশের মাটিকে রক্তে লাল করে দিচ্ছে। আবার সারা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে যথা আফগানিস্থান, সিরিয়া, আলজেরিয়া প্রমুখ দেশে উগ্র ইসলামিক মৌলবাদ ইসলামিক স্টেট নাম ধরে বা আফগানিস্থানে তালিবান নাম ধরে শুধু অমুসলিমদেরকেই নয়, সুস্থ চিন্তার মুসলিম ভাইবোনদেরকে খুন করছে। ভারতবর্ষে দিকে দিকে উগ্র হিন্দু মৌলবাদীরা খৃষ্টান ও মুসলিমদের রক্তে যমুনা--গঙ্গা--সবরমতীর তীরকে ভাসিয়ে দিচ্ছে। উত্তরপূর্ব্ব ভারতে উগ্র খৃষ্টান আধিপত্যবাদ ও উগ্র হিন্দু মৌলবাদীদের দ্বন্দ্বে মণিপুরসহ বিভিন্ন সবুজ পাহাড় আজ রক্তে লাল। সংকীর্ণ মুসলিম বিদ্বেষের দৃষ্টিকোণে উগ্র ইহুদি মৌলবাদ জর্ডানের তীর ও গাজার প্রান্তরকে লালে লাল করে দিচ্ছে মানুষের রক্তে।

মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ তার সংকীর্ণ তেলের রাজনীতির স্বার্থে ইসরায়েলকে মদত করে গোটা মধ্যপ্রাচ্যকে কেন্দ্র করে তৃতীয় মহাযুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরী করছে। ইরাণ, লেবালন প্রমুখ দেশ মানবতার বৃহত্তর স্বার্থে প্যালেস্টাইন মুক্তি সংগ্রামীদের পাশে সংগত কারণেই দাঁড়িয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ আজ প্যালেস্টাইনের পক্ষে থাকলেও মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও ইসরায়েল মরীয়া হয়ে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। লজ্জার কথা যে আমাদের দেশের ঐতিহ্যগত সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী আদর্শকে জলাঞ্জলি দিয়ে ভারত সরকার ইসরায়েল ও আমেরিকার এই যুদ্ধ প্রয়াসকে সমর্থন করছে। এক কথায় বিশ্ব শান্তি ও নিরাপত্তা আজ বিপন্ন। 

এই পরিস্থিতিতে গোটা পৃথিবীকে বাঁচাতে পবিত্র ফতেহা দোয়াজ দহমের ও ইয়াজ দাহামের দিনে, এবারে মোমিন ভাইরা অবশ্যই প্রার্থনা করবেন সাম্রাজ্যবাদ ও সব রকমের ধর্মীয় মৌলবাদের নিশ্চিত পরাজয় ও মানবতাবাদ এবং বিশ্ব শান্তিরবাদের তথা প্যালেস্টাইন মুক্তি সংগ্রামের জয়ের লক্ষে, এ আমাদের দৃঢ় আশা ও প্রত্যয়। 

 

      

লেখক পরিচিতি

অধ্যাপক খগেন্দ্রনাথ অধিকারী রাষ্ট্রীয় বিদ্যাসরস্বতী পুরস্কার ও এশিয়া প্যাসিফিক পুরস্কার সহ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বহু পুরস্কার প্রাপ্ত একজন খ্যাতনামা শিক্ষাবিদ। ইনি কোলকাতার সাউথ সিটি (দিবা) কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ।

ঠিকানা-শরনিয়ার বাগান

পোষ্ট-টাকী, পিন-৭৪৩৪২৯

পশ্চিমবঙ্গ, ভারত

০৮:৩১ এএম, ১৫ অক্টোবর ২০২৪ মঙ্গলবার

ফাতেহা দোয়াজ  দাহাম ও ফাতেহা ইয়াজ দাহামের  দিনে  বিশ্ব মানবতার উত্তোরণে হোক দোয়া

ফাতেহা দোয়াজ দাহাম ও ফাতেহা ইয়াজ দাহামের দিনে বিশ্ব মানবতার উত্তোরণে হোক দোয়া

ফাতেহা দোয়াজ দাহাম ও ফাতেহা ইয়াজ দাহামের দিনে বিশ্ব মানবতার উত্তোরণে হোক দোয়া 

 

খগেন্দ্রনাথ অধিকারী

 

 আরবিতে ফতেহা শব্দের অর্থ হোল প্রার্থনা বা দোয়া। আর দোয়াজ দাহাম শব্দের অর্থ একসাথে বারোর প্রার্থনা। মহানবি হজরত মহম্মদের জন্মদিন হিসাবে এই দিবসটি পালন করা হয়। উল্লেখ্য যে ইসলাম ধর্মে জন্মদিন বা মৃত্যুদিনকে আড়ম্বর সহকারে পালনের বিধান নেই। অত্যন্ত অনাড়ম্বরভাবে মহানবির এই জন্মদিনটিকে বিশেষ প্রার্থনা, দোয়ার মাধ্যমে তাই উদ্‌যাপন করা হয়। ইংরাজী ৫৭০ মতান্তরে ৫৭১ খৃষ্টাব্দে মা ফতেমার গর্ভ থেকে মহানবি মক্কার এক পাহাড়ী উপত্যকায় জন্মগ্রহণ করেন। আসলে আরবি মাস "রবিউল আউয়াল"-এর ১২ তারিখে সোমবার হজরত মহম্মদ জন্মগ্রহণ করেন। তাই এই দিনের প্রার্থনাকে বারোর প্রার্থনা বা "ফতেহা দোয়াজ দাহাম" বলা হয়।

আর একটি কথা। "রবিউল" শব্দের আরবিতে অর্থ হোল বসন্ত বা চিরসবুজ। ইসলামী বিশেষজ্ঞরা বলেন যে মক্কাসহ গোটা আরব ভূখণ্ড ছিল মরুময়। কিন্তু মা ফতেমার গর্ভে মহানবি আসার সময় থেকে গোটা প্রাকৃতিক পরিবেশ সেখানে পাল্টে যায়। সবুজে সবুজে গোটা এলাকা ভরে যায়। গাছে গাছে দেখা দেয় রকমারী ফুল ও ফলের সমারোহ। মহানবির পবিত্র জন্মদিনে তাই বিশ্বজুড়ে ধর্মপ্রাণ মুসলিম ভাই বোনরা সর্ব্বশক্তিমানের কাছে দোয়া করেন, প্রার্থনা করেন বিশ্ববাসীর সুখ--শান্তি সমৃদ্ধির জন্য, ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত এক পৃথিবীর জন্য। এবারেও, এই ২০২৪ সালেও, ফতেহা দোয়াজ দাহামে তার কোনই অন্যথা হবে না। 

অনেকেই ফতেহা দোয়াজ দাহাম ও ফতেহা ইয়াজ দাহাম এই দুইটিকে এক করে ফেলেন।ইয়াজ দাহাম কিন্তু ফরাসী শব্দ ।এর অর্থ হলো এগারোতম দিন ।এটি হোল হজরত কাদের জিলানির ওফাত দিবস।হিজরি পাঁচশ একষট্টি সালের এগারোই রবিউস সানি ওনার এন্তেকাল হয়।তাঁর স্মরণে বিশ্বজুড়ে এইদিন প্রার্থনা করেন শান্তি ও সম্প্রীতির জন্য ।পনেরোই অক্টোবর দুহাজার চব্বিশে এবারে সেই ফতেহা ইয়াজ দাহামের দিন।আর দুহাজার চব্বিশ সালের ষোলই সেপ্টেম্বর ছিল ফতেহা দোয়াজ দাহামের দিন।

আমরা জানি যে আমরা আজ এই একবিংশ শতাব্দীতে, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিদ্যার বিস্ময়কর বিজয় যাত্রার যুগে বসবাস করছি। তবুও আমরা বোলবো যে মহানবি হজরত মহম্মদের ৫৭০/৫৭১ খৃষ্টাব্দে জন্মের পূর্ববর্তী সময়কাল ও আজকের যুগের তুলনামূলক বিচারে

কিম্বা পরমপূজ্য হজরত কাদের জিলানির পাঁচশ একষট্টি হিজরিতে ওফাত দিবসের বিচারে, ক্ষুধা--দারিদ্র্য--বেকারী--হানাহানি, ইত্যাদির দৃষ্টিকোণে, আমরা এখন মোটেও কোন ভালো অবস্থায় নেই। বরং বলা যায় যে আমরা বাহ্যিক দৃষ্টিতে অনেক উন্নততর অবস্থানে থাকলেও, আজো আমরা কার্যতঃ পড়ে আছি প্রাক--মহানবি--জন্মকালের আগের পরিস্থিতির মধ্যে। কি আমাদের রাজ্যপরিস্থিতি, কি আমাদের জাতীয় পরিস্থিতি, কি আমাদের বিশ্বপরিস্থিতি, সব কিছুর নিরীখে আমরা এই কথাই বলতে পারি।

প্রথমেই আমরা ধরি আমাদের রাজ্য পশ্চিমবাংলার অবস্থার কথা। আমাদের কবি দ্বিজেন্দ্রলাল রায় লিখেছিলেন--

"ধনধান্যে পুষ্পে ভরা,

আমাদের এই বসুন্ধরা।"

কিন্তু সেই "ধনধান্যে পুষ্পে ভরা বসুন্ধরা" আজ শশ্মানে পরিণত হয়েছে। কৃষি--শিল্প সমস্ত কিছুই আজ শেষ। বেকারীর পাহাড় এই রাজ্যে। হাজারো রকমের "ডোল" দেওয়ার ব্যবস্থা হয়েছে অমূক শ্রী তমুক শ্রী ইত্যাদির নামে। সীমাহীন দুর্নীতি ও দুর্বৃত্তায়ণ আজ এই রাজ্যে। দুর্বৃত্তদের হাতে মানুষ মরছে প্রতিদিন নির্বিচারে। দুর্নীতি জেনে ফেলেছিল বলেই আর. জি. কর মেডিক্যাল কলেজের তরুণী চিকিৎসককে খুন হতে হয়েছে। আজও তার কিনারা হয়নি। সরকারের প্রচার মাধ্যমে দুবেলা বলা হচ্ছে উন্নয়ন, উন্নয়ন। আমাদের জানতে ইচ্ছা করে এই উন্নয়ন কার উন্নয়ন? এই উন্নয়ন কি রিজওয়ানুয়ের বাবার উন্নয়ন? এই উন্নয়ন কি হরিয়ানার গোরক্ষকদের হাতে নিহত পশ্চিমবাংলার পরিযায়ী শ্রমিক সাবিরের পরিবারের উন্নয়ন? এই উন্নয়ন কি সিঙ্গুরে জমিহারা কৃষকদের উন্নয়ন অথবা যে তরুণরা রাজ্যে শিল্পায়ণের মাধ্যমে তাদের কর্মসংস্থানের স্বপ্ন দেখেছিল, এ উন্নয়ন কি তাদের উন্নয়ন? মোটেও তা নয়। এই উন্নয়ন হোল কিছু গোরু চোর, কয়লা চোর, বালি চোর, সোনা চোর, চাকরি চোর, মেছোঘেরীর মালিক, ইটভাঁটার মালিক, প্রোমোটার ও কনট্রাকটরদের উন্নয়ন। তারা রাতারাতি আঙ্গুল ফুলে কলা গাছ হচ্ছে। আর সাধারণ মানুষ দিন দিন আরও নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে। শাসকগোষ্ঠী কখনো সংখ্যালঘু তোষণ, কখনো সংখ্যাগুরু তোষণের মাধ্যমে হিন্দু--মুসলিমে বিভাজন তৈরী করে রাজ্যে ক্ষমতায় আছে। তাদের পুতনা রাক্ষসী রাজে কর্মহীন মানুষরা এরাজ্য ছেড়ে রুটি রুজির সন্ধানে ভিন রাজ্যে যাচ্ছে। সেখানে গিয়ে অপুষ্টি, অর্ধাহার, অস্বাস্থ্যকর কাজের পরিবেশ, ইত্যাদিতে কঠিন রোগে আক্রান্ত হয়ে কেউ কেউ মারা যাচ্ছে অকালে। আবার কেউ কেউ উগ্র ধর্মীয় মৌলবাদীদের আক্রমণের শিকার হয়ে লাশ হয়ে ফিরে আসছে শ্মশান শয্যায় বা গোরস্থানে। 

তাই এবারে ফতেহা ইয়াজ দাহামে বা দোয়াজ দাহামে মোমিন ভাইদের প্রার্থনা হবে পশ্চিমবাংলা যেন ধাপ্পাবাজি "লক্ষ্মীরভাণ্ডার"-এ পরিণত না হয়ে সত্যিকারের লক্ষ্মীর ভাণ্ডারে পরিণত হয়। যেন কৃষি, শিল্প, সামাজিক পরিবেশ সব কিছুতেই এই রাজ্যে মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরী হয় এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির প্রকৃত বাতাবরণের আবহে যেন কবিগুরুর পদধূলি ধন্য বাংলা "সোনার বাংলা"য় পরিণত হয়। সমৃদ্ধিতে পশ্চিমবাংলা আগামী দিনে ভরে উঠুক, এটাই হোক এই দুই দিবসের আবেদন ।

ঠিক একইভাবে এই পবিত্র দিনদুইটিতে সর্ব্বশক্তিমানের কাছে তাঁদের প্রার্থনা হোক ভারতের স্থিতি, স্থায়িত্ব, ও সমৃদ্ধি নিয়ে। ইতিহাস সাক্ষ্যদেয় যে আমাদের এই মহানদেশ একা হিন্দুর নয়, একা মুসলমানের নয়, একা খৃষ্টানের নয়, এই দেশ হোল হিন্দু--মুসলিম--বৌদ্ধ--খৃষ্টান সকলের। বহুত্ববাদী সংস্কৃতির যে ধারা অশোক--আকবর--দারাশিকো--বিবেকানন্দ--রবীন্দ্রনাথ--কাজী নজরুল প্রমুখের হাতে সমৃদ্ধ হয়েছে, সেই ধারা আজ আমাদের দেশে বিপন্ন। আমাদের দেশে আজ চলছে ধর্মীয় মেরুকরণের রাজনীতি। ফলে এদেশে আজ মানুষ গৌণ। মুখ্য হোল তার ধর্মীয় পরিচয়। কোথাও এখন এই আসমুদ্রহিমাচল ভারতবর্ষের কোথাও কোথাও একজন মানুষের জীবনের চেয়ে একটি গোরুর মূল্য অনেক বেশী। কোথাও রামের নামে, কোথাও রহিমের নামে হচ্ছে নির্মম নিষ্ঠুর গণহত্যা। আমাদের জন্মভূমি ভারতবর্ষ এই গভীর সংকটের হাত থেকে মুক্ত হোক এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির পরিমণ্ডল পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হোক, এটাই হোক সকল মোমিনের দোয়া। 

আমাদের দেশ ঐতিহ্যগতভাবে বরাবর সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী, বর্ণ বৈষম্যবাদ বিরোধী ও ঔপনিবেশিকতাবাদ বিরোধী। কিন্তু সেই মহান আদর্শ থেকে বিচ্যূত হয়ে আমাদের দেশের বর্তমান সরকার এখন সাম্রাজ্যবাদীদের তাঁবেদারে পরিণত হয়েছে। এদেশের শুভবুদ্ধি সম্পন্ন সকল মানুষ জাতিধর্ম নির্বিশেষে ভারত সরকারের এই লেজুড়বৃত্তির বিরুদ্ধে লড়ছেন। তাঁদের এই লড়াই যেন সফল হয় এবং এই লড়াই-এর চাপে যেন বর্তমান দিল্লীর সরকার বিদেশনীতির ক্ষেত্রে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী অবস্থান নিতে বাধ্য হয়, এটা হোক সকলের ঐ দিন দুইটিতে নমাজের শেষে মোনাজাত। 

পরিশেষে, আমাদের রাজ্য ও আমাদের দেশের মত গোটা বিশ্ব পরিস্থিতিও আজ খুব জটিল। সাম্রাজ্যবাদ ও সংকীর্ণ ধর্মীয় মৌলবাদ আজ রক্তের বন্যায় গোটা পৃথিবীকে আজ রক্তের বন্যায় ভাসিয়ে দিচ্ছে। কোথাও হিন্দু মৌলবাদ, কোথাও বৌদ্ধ মৌলবাদ, কোথাও খৃষ্টান মৌলবাদ, কোথাও ইহুদি মৌলবাদ ধর্মের দোহাই পেড়ে এই কাণ্ড করছে। মায়ানমারে বৌদ্ধ মৌলবাদীরা মুসলিম হবার অপরাধে রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুদের রক্তে সেদেশের মাটিকে রক্তে লাল করে দিচ্ছে। আবার সারা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে যথা আফগানিস্থান, সিরিয়া, আলজেরিয়া প্রমুখ দেশে উগ্র ইসলামিক মৌলবাদ ইসলামিক স্টেট নাম ধরে বা আফগানিস্থানে তালিবান নাম ধরে শুধু অমুসলিমদেরকেই নয়, সুস্থ চিন্তার মুসলিম ভাইবোনদেরকে খুন করছে। ভারতবর্ষে দিকে দিকে উগ্র হিন্দু মৌলবাদীরা খৃষ্টান ও মুসলিমদের রক্তে যমুনা--গঙ্গা--সবরমতীর তীরকে ভাসিয়ে দিচ্ছে। উত্তরপূর্ব্ব ভারতে উগ্র খৃষ্টান আধিপত্যবাদ ও উগ্র হিন্দু মৌলবাদীদের দ্বন্দ্বে মণিপুরসহ বিভিন্ন সবুজ পাহাড় আজ রক্তে লাল। সংকীর্ণ মুসলিম বিদ্বেষের দৃষ্টিকোণে উগ্র ইহুদি মৌলবাদ জর্ডানের তীর ও গাজার প্রান্তরকে লালে লাল করে দিচ্ছে মানুষের রক্তে।

মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ তার সংকীর্ণ তেলের রাজনীতির স্বার্থে ইসরায়েলকে মদত করে গোটা মধ্যপ্রাচ্যকে কেন্দ্র করে তৃতীয় মহাযুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরী করছে। ইরাণ, লেবালন প্রমুখ দেশ মানবতার বৃহত্তর স্বার্থে প্যালেস্টাইন মুক্তি সংগ্রামীদের পাশে সংগত কারণেই দাঁড়িয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ আজ প্যালেস্টাইনের পক্ষে থাকলেও মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও ইসরায়েল মরীয়া হয়ে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। লজ্জার কথা যে আমাদের দেশের ঐতিহ্যগত সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী আদর্শকে জলাঞ্জলি দিয়ে ভারত সরকার ইসরায়েল ও আমেরিকার এই যুদ্ধ প্রয়াসকে সমর্থন করছে। এক কথায় বিশ্ব শান্তি ও নিরাপত্তা আজ বিপন্ন। 

এই পরিস্থিতিতে গোটা পৃথিবীকে বাঁচাতে পবিত্র ফতেহা দোয়াজ দহমের ও ইয়াজ দাহামের দিনে, এবারে মোমিন ভাইরা অবশ্যই প্রার্থনা করবেন সাম্রাজ্যবাদ ও সব রকমের ধর্মীয় মৌলবাদের নিশ্চিত পরাজয় ও মানবতাবাদ এবং বিশ্ব শান্তিরবাদের তথা প্যালেস্টাইন মুক্তি সংগ্রামের জয়ের লক্ষে, এ আমাদের দৃঢ় আশা ও প্রত্যয়। 

 

      

লেখক পরিচিতি

অধ্যাপক খগেন্দ্রনাথ অধিকারী রাষ্ট্রীয় বিদ্যাসরস্বতী পুরস্কার ও এশিয়া প্যাসিফিক পুরস্কার সহ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বহু পুরস্কার প্রাপ্ত একজন খ্যাতনামা শিক্ষাবিদ। ইনি কোলকাতার সাউথ সিটি (দিবা) কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ।

ঠিকানা-শরনিয়ার বাগান

পোষ্ট-টাকী, পিন-৭৪৩৪২৯

পশ্চিমবঙ্গ, ভারত

০৮:২৯ এএম, ১৫ অক্টোবর ২০২৪ মঙ্গলবার

মধ্যপ্রাচ্য: শান্তির সন্ধানে

মধ্যপ্রাচ্য: শান্তির সন্ধানে

মধ্যপ্রাচ্য: শান্তির সন্ধানে

খগেন্দ্রনাথ অধিকারী

 

আজ থেকে ৮৫ বছর আগে উগ্র জাতীয়তাবাদের তথা ইহুদি বিদ্বেষবাদের পতাকা তুলে যেভাবে নাৎসী জার্মানী ইউরোপের বুকে যুদ্ধের দামামা বাজিয়ে ছিল এবং সেই যুদ্ধের দাবানলে গোটা বিশ্ব পুড়েছিল, ঠিক সেইভাবে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের মদতে উগ্র জাতীয়তাবাদ তথা মুসলিম বিদ্বেষবাদের পতাকা তুলে ইসরায়েল আজ মধ্যপ্রাচ্যে সর্ব্বনাশা যুদ্ধের আগুণ জ্বেলেছে এবং সেই আগুণ সারা পৃথিবীব্যাপী ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্খা দেখা দিয়েছে। আমেরিকা--ইসরায়েলের এই রক্তহোলি খেলার নেশা সারা দুনিয়ার শান্তিকামী মানুষকে চিরতরে মিটিয়ে দিতে হবে--এটাই হোক চন্দ্র--সূর্য--গ্রহ--তারা--আকাশ--বাতাস--সাগরের তরঙ্গমেলা, সবারই এক আওয়াজ।

কবিগুরুর কথার প্রতিধ্বনি দিয়ে বলতে হয়, "মরিতে চাহিনা আমি সুন্দর ভুবনে"--এটাই হোল প্রত্যেক মানুষের মনের কথা। কোন মানুষই মরতে চায় না। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের সুরে প্রকাশ্যে--অপ্রকাশ্যে সব মানুষই বলতে চায়, "তোমার দেওয়া এই বিপুল পৃথিবী সকলে করিব ভোগ।" কিন্তু, তবুও আমরা দেখছি যে নির্বিচারে বছরের পর বছর ধরে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও তার তাঁবেদার ইসরায়েলের হাতে মানুষ মরছে। তবু মধ্যপ্রাচ্যের মানুষ কিন্তু দমছে না। বরং, জীবন মৃত্যুকে পায়ের ভৃত্যকরে মানুষ সেখানে সংগ্রাম করছে। প্রতিদিন অগণিত স্ত্রী হারাচ্ছে তাদের স্বামীকে, স্বামীরা হারাচ্ছে তাদের স্ত্রীকে, বাবা মা হারাচ্ছে তাদের সন্তানকে। 

তবু, লোহিত সাগরের তীরে, জর্ডানের কূলে, গাজার প্রান্তরে দাঁতে দাঁত চেপে, চোখের জলকে জ্বালানী বানিয়ে মানুষ লড়ছে। আসলে এই মানুষগুলি মানবতার পক্ষে লড়ছে, শান্তির লক্ষ্যে লড়ছে, ধ্বংসের বিরুদ্ধে, মৃত্যুর বিরুদ্ধে, জীবনের পক্ষে, সৃজনের স্বার্থে লড়ছে। অনেকে ভাবের ঘরে চুরি করেন। তাঁরা মধ্যপ্রাচ্যের বিবাদমান পক্ষগুলিকে, অর্থাৎ মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ, ইসরায়িলী আগ্রাসনবাদ এবং এদের পাশাপাশি ইরাণ--ইয়েমেন--লেবানন--প্যালেস্টাইনের সামরিক পদক্ষেপকে একাকার করে দেখছেন। কিন্তু, এটা মোটেও যুক্তিযুক্ত দৃষ্টিভঙ্গি নয়। আক্রমণ ও আত্মরক্ষা দুটো মোটেও এক বস্তু নয়। এক হতে পারে না।

এই প্রসঙ্গে সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের সনদের ভাবাদর্শকে এখানে তুলে ধরতে চাই। জাতিপুঞ্জের সনদে যুদ্ধকে দুইভাগে ভাগ করা হয়েছে: "aggressive war" বা আক্রমণাত্মক যুদ্ধ এবং "defensive war" বা আত্মরক্ষামূলক যুদ্ধ। এই সনদ অনুযায়ী আত্মরক্ষামূলক যুদ্ধ বৈধ। অবৈধ হোল আক্রমণাত্মক যুদ্ধ। আক্রমণাত্মক যুদ্ধের বিরুদ্ধে জাতিপুঞ্জের সনদে যৌথ নিরাপত্তা বা "Collective Security"-র কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ, জাতিপুঞ্জের সনদ অনুযায়ী বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তার স্বার্থে, আক্রান্ত দেশের পক্ষে সমস্ত দেশ যৌথ নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নিতে পারে।

আজকের মধ্যপ্রাচ্যের অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতির সঠিক বিশ্লেষণ করতে গেলে জাতিপুঞ্জের সনদের এই আলোকে সকলকে তা করতে হবে। মধ্যপ্রাচ্যে আজ বিধ্বংসী যুদ্ধ শুরু হয়েছে এবং এই আঞ্চলিক যুদ্ধ বা "Regional war" একটি বিশ্বযুদ্ধ বা "World war" -এর চেহারা নিতে পারে। কিন্তু কথা হোল যে মধ্যপ্রাচ্যে এই বিধ্বংসী যুদ্ধের আবহে প্রকৃতপক্ষে আক্রমণকারী কে এবং আক্রান্তই বা কে? একথা বলার কোন অপেক্ষাই রাখে না যে মধ্যপ্রাচ্যে আক্রমণকারী হোল মার্কিন মদতপুষ্ট ইসরায়েল। আর আক্রান্ত হচ্ছেন প্যালেস্টাইনের স্বাধীনতাকামী জণগন। বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষার জন্য গঠিত আন্তর্জাতিক সংগঠন সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বারে বারে ঘোষণা করেছে যে মার্কিন মদতপুষ্ট ইসরায়েলই হোল আক্রমণকারী, আর প্যালেস্টাইনী জনগণ হোল আক্রান্ত। 

এতে আমেরিকা--ইসরায়েল খুবই অসন্তুষ্ট জাতিপুঞ্জের উপরে। জাতিপুঞ্জের কোন কর্মকর্তাকে ইসরায়েল তার ভূখণ্ডে ঢুকতে দিচ্ছে না। এমনকি জাতিপুঞ্জের মহাসচিব এ্যাণ্ডোনিও গুতেরেসকে ইসরায়েল নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। অর্থাৎ, বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষার আন্তর্জাতিক সংগঠন সম্মিলিত জাতিপুঞ্জকেও সে চ্যালেঞ্জ করছে। কারণ সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ ও তার মহাসচিব গুতেরেস প্যালেস্টাইনবাসীর স্বাধীনতা সংগ্রামকে সমর্থন করছেন। বিশ্বের একশ ছেচল্লিশটি দেশ প্যালেস্টাইনকে সার্ব্বভৌম দেশ হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছে। নরওয়ে সহ ইউরোপের তিনটি দেশ তাকে স্বীকৃতি দিয়েছে। স্বীকৃতি দেয়নি উগ্র মুসলিম মৌলবাদীদের সমর্থনপুষ্ট তথা মার্কিন উচ্ছিষ্টভোগী বর্তমান বাংলাদেশ সরকার তথা তার প্রধান ইউনুস।

আর দুর্ভাগ্যের কথা হোল যে আমাদের দেশ ভারতবর্ষ বরাবর জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের পাশে থেকেছে। কি ১৯৬০ সালের কঙ্গোর প্রশ্নে, ভিয়েৎনাম প্রশ্নে বাংলাদেশ প্রশ্নে, সব সময়ই আমাদের জনগণ ও সরকার জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের পাশে থেকেছে। পণ্ডিত নেহেরুর ভাষায়, "Where freedom is menaced and justice threatened, we cannot be and shall not be neutral." অর্থাৎ স্বাধীনতা যেখানে বিপন্ন, মানব অধিকার যেখানে পদদলিত, সেখানে আমরা নির্লিপ্ত থাকতে পারি না, নির্লিপ্ত থাকবো না। বস্তুতঃপক্ষে, এযাবৎকালের যাবতীয় ভারত সরকার প্যালেস্টাইন মুক্তি আন্দোলনের পাশে থেকেছে। নরেন্দ্রমোদী সরকারই তার ব্যতিক্রম। এই সরকার প্যালেস্টাইনে ইসরায়েল--মার্কিন জোটের নির্বিচার গণহত্যাকে মদত করছে। এটা আমাদের সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী বিদেশ নীতির পরিপন্থী। 

আমরা বিশ্বাস করি যে বিশ্বজনমতের চাপ তথা ভারতবাসীর সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী মেজাজের চাপ মোদী সরকারকে বাধ্য করবে এই ভ্রান্ত পথ থেকে সরে আসতে। ইতিমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের আবহে ইরাণ, লেবালন, ইয়েমেন প্রভৃতি দেশ রণাঙ্গনে এসে গেছে। সাম্রাজ্যবাদের দালাল কিছু লোক সংকীর্ণ ধর্মীয় মৌলবাদী দৃষ্টিকোণে কুৎসা করছে যে " মুসলমানরা সব এক হয়ে জাতের টান টানছে।" এটা একটা বর্বরসুলভ মন্তব্য। মধ্যপ্রাচ্যে "মুসলমানরা সব এক হয়ে জাতের টান টানছে" না। তা যদি হবে তাহলে ঢাকার মসনদে বলে থাকা ঐ মার্কিন দালালটা (ইউনুস) কি? ওটা কি হিন্দু? না বৌদ্ধ? না খৃশ্চান? ওটা কি তথাকথিত ধর্মসূত্রে মুসলিম নয়?

আসলে হিন্দু--মুসলিম--বৌদ্ধ--খৃশ্চান--কোন জাতের বা ধর্মের প্রশ্ন নয়। প্রশ্নটা হোল মানবতাবাদের। প্রশ্নটা হোল মানুষ নামক জাতের। আমাদের কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের কথায়--

"জগৎ জুড়িয়া এক জাতি আছে,

সে জাতির নাম মানুষ জাতি।"

"মুসলমান" নয়, খৃশ্চান নয়, বৌদ্ধ নয়। মানুষ নামক এই জাতিটার অস্তিত্ব আজ মার্কিন--মদতপুষ্ট ইসরায়েলী আক্রমণে বিপন্ন। এই আক্রমণকারীর বিরুদ্ধে প্যালেস্টাইনের স্বপক্ষে জাতিপুঞ্জের সনদের যৌথ নিরাপত্তা বা "Collective Security"-র নীতির ভাবাদর্শে ইরাণসহ বিশ্বের শুভবুদ্ধি সম্পন্ন বিভিন্ন দেশ আগ্রাসী ইসরায়েল--আমেরিকার বিরুদ্ধে আক্রান্ত প্যালেস্টাইনের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। আগামী দিনে আরও বিভিন্ন দেশ তার পাশে এসে দাঁড়াবে। তার পদধ্বনি স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। 

উল্লেখ্য যে ১৯৩৯ সালে হিটলার যখন সোভিয়েত ইউনিয়ন আক্রমণ করে, তখন League of Nations ও নেই, আবার United Nations ও উদ্ভূত হয়নি। কিন্তু যৌথ নিরাপত্তার আদর্শ তখন মানুষের ভাবাদর্শের জগতে আত্মপ্রকাশ করেছে। তারই ভিত্তিতে বিশ্ববাসী সহ সারা পৃথিবীর নাৎসী বিরোধী--ফ্যাসিবিরোধী দেশসমূহ আক্রান্ত সোভিয়েত ইউনিয়নের পাশে দাঁড়িয়েছিল। আজ সারা পৃথিবীর সকল সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী দেশ জাতিপুঞ্জের যৌথ নিরাপত্তা নীতির আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে প্যালেস্টাইন মুক্তিসংগ্রামের পাশে দাঁড়িয়েছে ও দাঁড়াচ্ছে। বিশেষতঃ, শিয়া--সুন্নি বিরোধের সুযোগে ইরাণ--ইরাক বিভাজন তৈরী করে ওয়াশিংটন সাদ্দাম হোসেনকে অপসারিত করে খুন করেছিল ও মধ্যপ্রাচ্যকে নিষ্কন্টক করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু সদ্য প্রতিষ্ঠিত শিয়া--সুন্নি প্রধান ইরাণ--ইরাক বোঝাপড়া সাম্রাজ্যবাদীদের ঘুম কেড়ে নিয়েছে। ওরা আজ আরও মরীয়া। মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইলী--মার্কিন হানার তীব্রতা তারই প্রমাণ। এ ওদের দোজক যাত্রার, নরক যাত্রার পূর্বাভাষ। ভিয়েৎনাম, বাংলাদেশ, সর্বত্রই সাম্রাজ্যবাদীরা এটা করেছিল, মধ্য প্রাচ্যেও ওরা তাই করছে। কিন্তু, পারবে না। ওদের পরজয় ও মানবতার জয় অবশ্যম্ভাবী। শুধু সময়ের কিছু অপেক্ষা। 

 

      

লেখক পরিচিতি

অধ্যাপক খগেন্দ্রনাথ অধিকারী রাষ্ট্রীয় বিদ্যাসরস্বতী পুরস্কার ও এশিয়া প্যাসিফিক পুরস্কার সহ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বহু পুরস্কার প্রাপ্ত একজন খ্যাতনামা শিক্ষাবিদ। ইনি কোলকাতার সাউথ সিটি (দিবা) কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ।

ঠিকানা-শরনিয়ার বাগান

পোষ্ট-টাকী, পিন-৭৪৩৪২৯

পশ্চিমবঙ্গ, ভারত

 

০১:৫৫ পিএম, ১৩ অক্টোবর ২০২৪ রোববার

Puspaprovat Patrika