শুক্রবার   ১৭ এপ্রিল ২০২৬   বৈশাখ ৪ ১৪৩৩   ২০২৬৭ ২০২৬৩ ২০২৬১

পুষ্প প্রভাত

আব্দুর রাউফ

পুষ্পপ্রভাত পত্রিকা

প্রকাশিত : ০৬:২৬ এএম, ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সোমবার | আপডেট: ০৬:২৬ এএম, ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সোমবার

পুষ্প প্রভাত

 

আব্দুর রাউফ

 

কালিয়াচকের ভোরে কুয়াশা নামে—

কে জানে কখন থেকে,

মাঠের উপর ধূসর শ্বাস ফেলে

নিস্তব্ধ ঘাসের ডগায় থেমে থাকে কিছুক্ষণ।

মনে হয়—

বহুদিনের অন্ধকারে চাপা পড়ে থাকা

একটি পুরোনো দলিল

ধীরে ধীরে খুলে যাচ্ছে বাতাসে,

তার ভাঁজে লেগে আছে

মলিন সময়ের গন্ধ।

দূরে—

অতি দূরে কোথাও

ছাপার মেশিনের ধাতব হৃদয়

নিভৃত ঘূর্ণনে কেঁপে ওঠে।

আমি শুনি—

এ কেবল শব্দ নয়,

এ সময়ের চাকা,

রাত্রির অদৃশ্য কাঁধে ভর দিয়ে

ঘুরে চলে নিরবধি।

যখন প্রথম

পুষ্প প্রভাত ফুটেছিল কালো অক্ষরে,

তখন এই জনপদের সকাল

আরও ধীর ছিল—

রেশমের সুতোয় শিশির ঝুলত,

পরিযায়ী মানুষের ক্লান্ত পিঠে

লবণাক্ত ঘাম শুকাত রোদে,

আম-লিচুর বাগানে

অর্ধেক আলো, অর্ধেক ছায়া

চুপ করে বসে থাকত।

পাঁচতলা মসজিদের মিনার ছুঁয়ে

আজান ভেসে যেত কুয়াশার ভিতর—

যেন সোনালী চিল ফিরোজ মিনারে বসে

ডানা নাড়ছে খুব ধীরে।

বাবুর হাটের ধুলোয়

মানুষ তখনও স্বপ্ন কুড়াত—

ঝরা নিমপাতার মতো

হালকা, তবু অদ্ভুত ভারী।

বত্রিশ বছর—

সময়ের কাছে এ কি খুব বেশি?

তবু এই কাগজ হেঁটেছে

পাগলার ঘোলা জল মাড়িয়ে, ভাগীরথীর কোলাহল ছুঁয়ে,

গঙ্গার ভাঙনের দীর্ঘ, লবণাক্ত কান্না শুনে।

এক সময় কাগজই ছিল জানালা—

এখন আলো বদলেছে;

অক্ষর ভেসে যায়

পর্দার নীল, অস্থির নদীতে,

দ্রুত স্ক্রলের বাতাসে

খবরের আয়ু কমে আসে প্রতিদিন।

তবু—

মাটির গন্ধ কি বদলায়?

কালিয়াচকের ভোরে আজও

ভেজা মাটির ভিতর থেকে

এক পুরোনো সুর উঠে আসে—

ধীরে, খুব ধীরে।

দুই লক্ষ মানুষের চোখ

আজও তোমার দিকে ঝুঁকে থাকে—

এ শুধু পাঠ নয়,

এ বহু দিনের বিশ্বাস,

শুকনো পাতার নিচে চাপা

উষ্ণ মাটির মতো।

শ্রাবণের অন্ধকার মাঠে

হঠাৎ যেমন জোনাকি জ্বলে—

নিভে যায়, আবার জ্বলে—

তেমনি তোমার পাতায়

ছোট ছোট ইতিহাস

নীরবে আলো ছড়ায়।

পুষ্প প্রভাত—

তুমি কেবল খবরের কাগজ নও,

তুমি সময়ের গোপন খাতা,

মানুষের হাতের ঘাম শুকিয়ে ওঠা

এক দীর্ঘ, নিঃসঙ্গ দলিল।

চলতে থাকো—

যেমন নদী মানচিত্র মানে না,

যেমন ভোর প্রতিদিন

অদৃশ্য কুয়াশা ভেদ করে জন্মায়।

কালিয়াচকের বুকের ভিতর

যতদিন মানুষের পদচিহ্ন থাকবে,

ততদিন তুমি থাকবে—

ধূসর, ধীর, অনমনীয়—

এক অনন্ত ভোরের মতো।

 

 ১৫ - ই ফেব্রুয়ারী ২০২৬

জালালপুর মালদা।