মিনু
সুজন মন্ডল
পুষ্পপ্রভাত পত্রিকা
প্রকাশিত : ০৮:৪৫ পিএম, ১ জানুয়ারি ২০২৬ বৃহস্পতিবার | আপডেট: ০৮:৪৫ পিএম, ১ জানুয়ারি ২০২৬ বৃহস্পতিবার
*মিনু*
মিনু আজকাল বাড়ির বাইরে তেমন বেরোয় না। প্রথমত, তার কোনো কাজ নেয়, বিড়ি বাঁধতে জানে কিন্তু লকডাউন চলার ফলে বিড়ি মালিকরা ( চাঁই ভাষায় -মারচ্যন) পাতা ছাড়তে আসে না। দ্বিতীয়ত, ওরা খুবই গরীব বলে পাড়ার অতি অল্প-বেশি পয়সাওয়ালা লোকের ছেলে মেয়েরা তাকে ভালোবাসে না তাই ছুটিতে বাড়ির কাজ না থাকলে বাড়ির সামনের বাগানে ঘুরে বেড়ায় । ... হ্যাঁ, তার বয়স এগারো বছর। স্কুলে যায়। ক্লাস ফাইভে পড়ে। পাড়ার কেউ তেমন কথা না বললেও স্কুলে তার অনেক বন্ধু । স্কুলের বন্ধুরা তাকে খুব ভালোবাসে কারণ সে সবাইকেই মুখের উপর সত্যি কথা বলে দেয়। কিন্তু সেই জন্যই হয়তো তার বড়োদের,এমনকি স্যার -ম্যাডামদের কাছে স্নেহের ছাত্রী হতে পারেনি মিনু।
আজ খুব সকালে ঘুম থেকে উঠে বাড়ির উঠানে মন খারাপ করে বসে আছে মিনু। বৃষ্টি ভেজা দিন। তার মা তাকে রেগে বলছে - কদিন থেকে ব্যাঙ্কে যেতে বলছি তো কি হচ্ছে, শুনতে পাস না..? আমার কথা শুনে আর কি হবে.... বাগানে সারাদিন টো টো করে ঘুরে বেড়াবে... ঘরে একটা টাকা নাই, ঐ পাঁচশো টাকাটা আনলেও তো একটু সুবিধা হয়, লোকের কাছে হাত পাততে হয় না...!
আধার লিঙ্ক করতে হবে বলেছে।
তো গিয়ে করে আয় যা ----
কিছুক্ষণ পর ব্যাঙ্কমিত্র কেন্দ্রে পৌঁছাতেই তার মাস্টার মশাই এর সঙ্গে দেখা। তিনিও তার ছেলের অ্যাকাউন্ট চেক করতে এসে বৃষ্টি শুরু হয়েছে বলে বসে রইলেন।
বিধি রক্ষার্থে মাস্টার মশাই ডেকে বললেন --মেনকা, কেমন আছো ? মেয়েটি পড়াশোনায় খুব ভালো..... এই বলে আমার দিকে তাকিয়ে সম্মতি আদায়ের চেষ্টা করলেন।
হ্যাঁ, মেয়েটির মা তাকে মিনু বলে ডাকলেও তার আসল নাম মেনকা মণ্ডল। সে একটি খুব গরীব চাঁই পরিবারের মেয়ে। চাঁই ভাষায় কথা বলতে খুব ভালো পারে।
তার স্যারকে সম্মতি সূচক ইঙ্গিত দিয়ে নিজের কাজে মন দিল।
মিনু তার কাগজ পত্র ম্যানেজার মানে আমার হাতে দিলে তাকে তার নাম সই করতে বলা হয়।
আর হলো না.........
তার সহি করা আর হলো না..।
আরে তুই ক্লাস ফাইভে পড়িস না ?..
হ্যাঁ....
তো কি হলো .. এখানে..... এখানে তোর নাম লেখ্ ।
------ পারি না..।
এটা কেমন কথা.....?
তুই ফাইভে পড়িস, আর নিজের নাম লিখতে পারিস না......।
হতচকিত স্বরে উত্তর এলো --লকডাউনে স্কুল বন্ধ তো তা-ই -ই হয়তো ভুলে গেছে সব.... ।
না আমি ভুলিনি।
তবে ?
কআ কারে কা আর বানান শিখতে শিখতে তো ছুটি হয়ে গেছে স্কুল ....
ঠিক আছে, তোকে সই করতে হবে না। বাম হাতের বুড়ো আঙুলে টিপ দে ...।প্রথমে রাজি না হলেও টিপ দিয়ে বাড়ি ফিরলো।
আসলে এরা খুব একটা পড়তে পারবে না। গরীব ঘরের তো...।
আসলে কি মাস্টার মশাই... আপনি চাঁই জন গোষ্ঠীভুক্ত এলাকায় খুব সুখে চাকরি করেন।
হ্যাঁ, এই এলাকায় অনেক দিন আছি। তবে এদের দ্বারা কিছু হবে না বুঝলেন । যারা পড়তে চাই তারা তো টাউনে চলে যায়..... । আরে আমার ছেলেকে আজ হোস্টেলে রাখতে যেতে হতো কিন্তু ভাইরাসের জন্য কিছু দিন আরো বাড়িতে থাকতে হবে।
আচ্ছা, আপনার ছেলেকি আপনার স্কুলে পড়ে না ?
...আরে না, এই গেঁয়ো পরিবেশে আমার ছেলে মানুষ হতে পারবে না.......।
আপনার ছেলে মানুষ হবে,নামীদামী বেসরকারী স্কুলে পড়বে আর এরা গঙ্গার জলের তোড়ে যুগ যুগ ধরে ভেসে যাবে।......
সত্যিই বলেছেন, হতদরিদ্র গোষ্ঠী নিজের পেটের ভাত জোগাড় করতে গিয়ে শোষকদের দ্বারা শোষিত হতে, অন্যের পদলেহন করতে,আত্মকলহে লিপ্ত হতে শিখেছে ....তারা শেখেনি নিজ অধিকার কাকে বলে, শেখেনি তার স্বপ্ন ধরে রাখতে... শেখেনি প্রতারক হতে....
তাই তো সমাজের নিয়ন্ত্রকদের হাতে বহু দিন ধরে প্রতারিত হতেই থেকেছে .....
কিন্তু সময় বদলেছে....আমরা আর প্রতারিত হবো না ।নিজের অধিকার বুঝে নেবই ।
পড়বো... পড়াবো। শিখবো.... শেখাবো।
অনুন্নত সমাজকে অশিক্ষার অন্ধকার থেকে আলোর দিশারী করবো।
আমরা এগোবো, দেশ এগোবে। বিশ্বমাঝে আমার দেশ শ্রেষ্ঠ আসন নেবে ।
