রোববার   ০৯ আগস্ট ২০২৬   শ্রাবণ ২৫ ১৪৩৩   ২০২৬৭ ২০২৬৩ ২০২৬১

সাংবাদিক বাবুল হকের জীবনপঞ্জি:

মফস্বল সাংবাদিকতা থেকে সংবাদ প্রতিদিনের স্টাফ রিপোর্টার

এম আনওয়ার উল হক

পুষ্পপ্রভাত পত্রিকা

প্রকাশিত : ০১:৫৯ পিএম, ৯ আগস্ট ২০২৬ রোববার | আপডেট: ০১:৫৯ পিএম, ৯ আগস্ট ২০২৬ রোববার

সাংবাদিক বাবুল হকের জীবনপঞ্জি: মফস্বল সাংবাদিকতা থেকে সংবাদ প্রতিদিনের স্টাফ রিপোর্টার

 

এম আনওয়ার উল হক

 

মালদার সাংবাদিকতা জগতে বাবুল হক ছিলেন এক পরিচিত, আপন এবং স্বতন্ত্র মুখ। কয়েক দশকের দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবনে তিনি দেখেছেন নানা উত্থান-পতন, রাজনৈতিক পালাবদল, সংবাদপত্রের পরিবর্তিত সময় এবং মফস্বল সাংবাদিকতার কঠিন বাস্তবতা। কিন্তু পরিস্থিতি যতই প্রতিকূল হোক, খবরের প্রতি তাঁর টান এবং সাংবাদিকতার প্রতি নিষ্ঠা কখনও কমেনি। অসুস্থ শরীরেও কাজ করে যাওয়ার যে অদম্য মানসিকতা তিনি দেখিয়েছেন, তা মালদার সাংবাদিক মহলে দীর্ঘদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

 

১৯৭১ সালের ৬ অক্টোবর মালদা জেলার কালিয়াচক থানার অন্তর্গত সুজাপুরে জন্ম বাবুল হকের। বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান ছিলেন তিনি। ছোটবেলা থেকেই প্রাণবন্ত, স্পষ্টবাদী এবং মানুষের সঙ্গে সহজে মিশে যাওয়ার স্বভাবের কারণে অল্প সময়েই এলাকার মানুষের আপনজন হয়ে উঠেছিলেন।

 

সাংবাদিকতায় তাঁর হাতেখড়ি মালদা শহর থেকে প্রকাশিত ‘রূপান্তরের পথে’ পত্রিকার হাত ধরে। সম্পাদক প্রভাত চৌধুরীর সান্নিধ্যে সাংবাদিকতার প্রাথমিক পাঠ নেন তিনি। এরপর তৎকালীন রাজ্য সরকার পরিচালিত দৈনিক ‘বসুমতী’ পত্রিকায় মালদা জেলার সংবাদদাতা হিসেবে কাজ শুরু করেন। সেখান থেকেই তাঁর সাংবাদিকতা জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা।

 

পরবর্তীতে বামফ্রন্ট সরকারের সময় দৈনিক বসুমতী বন্ধ হয়ে গেলে সাংবাদিকতার পথে নতুন করে সংগ্রাম শুরু করতে হয় তাঁকে। কিন্তু থেমে থাকার মানুষ ছিলেন না বাবুল হক। একের পর এক সংবাদপত্র ও প্রকাশনার সঙ্গে যুক্ত থেকেছেন। ‘বঙ্গলোক’, ‘ভেরোনা’, ‘ওভারল্যান্ড’-সহ বিভিন্ন পত্রিকার সংস্থার প্রকাশনার সঙ্গেও তিনি কাজ করেছেন।

 

মালদা শহরের সাপ্তাহিক ‘জেলা বিচিত্রা’ এবং ‘সান্ধ্য জেলা বিচিত্রা’-র নিউজ এডিটর হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৪ সালে ‘পুষ্প প্রভাত’ পত্রিকার জন্মলগ্ন থেকেই বাবুল হকের সঙ্গে এই পত্রিকার নিবিড় সম্পর্ক তৈরি হয়। পরামর্শ দেওয়া, সংবাদ পরিবেশন এবং নিউজ এডিটরের দায়িত্ব—বিভিন্ন ভূমিকায় দীর্ঘদিন তিনি ‘পুষ্প প্রভাত’-এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

 

পরবর্তী সময়ে ‘মালদহের সমাচার’, ‘গৌড় মালদা সংবাদ’-সহ বিভিন্ন সংবাদপত্রে কাজ করেন। কালিয়াচকের বাবলা থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক ‘অনবদ্য সংবাদ’ পত্রিকার নিউজ এডিটর হিসেবেও দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেছেন।

 

‘রূপান্তরের পথে’-র সম্পাদক প্রভাত চৌধুরী, ‘মালদহের সমাচার’-এর সম্পাদক সঞ্জীব চক্রবর্তী, ‘গৌড় মালদা সংবাদ’-এর সম্পাদক অভিজিৎ চৌধুরী-সহ মালদা শহরের বহু সাংবাদিক ও সংবাদপত্রের সঙ্গে যুক্ত মানুষের সঙ্গে তাঁর ছিল গভীর সম্পর্ক। অল্প সময়ের মধ্যেই সুজাপুরের এই তরুণ সাংবাদিক মালদার সাংবাদিক মহলে সবার আপনজন হয়ে উঠেছিলেন।

 

তরুণ তুর্কি সাংবাদিক হিসেবে কাজ করার সময়ই তাঁর সাংবাদিকতা বিভিন্ন মহলের নজর কাড়ে। তৎকালীন বামফ্রন্টের চেয়ারম্যান বিমান বসুর নজরেও তাঁর সাংবাদিকতা ও নিরপেক্ষ অবস্থান এসেছিল বলে সহকর্মীদের স্মৃতিতে উঠে আসে। ধর্মনিরপেক্ষ ও নিরপেক্ষ অবস্থান থেকে সাংবাদিকতা করতেন তিনি। সেই অবস্থানের কারণে কখনও কখনও তাঁকে স্থানীয়ভাবে নানা সমস্যারও সম্মুখীন হতে হয়েছে। এমন এক কঠিন সময়ে তৎকালীন ‘আজকাল’-এর সাংবাদিক অভিজিৎ চৌধুরীর সহযোগিতা তাঁর পাশে ছিল।

সুজাপুর থেকে "আমরা পড়তে চাই" পাক্ষিক পত্রিকা প্রকাশ ও সম্পাদনা করেছেন।

তাঁর সাংবাদিকতা জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাঁক আসে মালদা শহরের বিশিষ্ট ফটোগ্রাফার হরেন চৌধুরীর সহযোগিতায়। তাঁর হাত ধরেই বাবুল হক ‘সংবাদ প্রতিদিন’-এর সাক্ষাৎকার দিতে যান। সেখানে তাঁর সাংবাদিকতা, খবরের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি ও কাজের অভিজ্ঞতা তৎকালীন ম্যানেজমেন্টের নারায়ণ বসু ও টুটু বসুদের নজর কাড়ে। এরপর শুরু হয় সংবাদ প্রতিদিন-এর সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ পথচলা।

 

দীর্ঘদিন সংবাদদাতা হিসেবে কাজ করার পর পরবর্তীতে তিনি সংবাদ প্রতিদিনের স্টাফ রিপোর্টার হিসেবে দায়িত্ব পান এবং আমৃত্যু সেই দায়িত্বের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। মাঝেমধ্যে উত্তরবঙ্গের সংবাদ সংগ্রহ এবং উত্তরবঙ্গের দায়িত্বও সামলেছেন তিনি।

 

বাবুল হকের সাংবাদিকতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল তাঁর জিরো গ্রাউন্ড রিপোর্টিং। ঘটনাস্থলে পৌঁছে মানুষের কথা শোনা, ঘটনার প্রকৃত ছবি তুলে ধরা এবং খবরের ভিতরের খবর খুঁজে বের করা ছিল তাঁর স্বভাব। খবর কীভাবে তুলতে হয়, তা তাঁর লেখা পড়লেই বোঝা যেত। সহজ ভাষায়, তথ্যনির্ভর এবং ঘটনাকে খুব কাছ থেকে দেখার অভিজ্ঞতায় তাঁর প্রতিবেদন ছিল স্বতন্ত্র।

 

শেষ বিধানসভা নির্বাচনেও শারীরিক অসুস্থতা সত্ত্বেও বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে সংবাদ সংগ্রহ করেছেন। দীর্ঘদিন ধরে লিভারজনিত সমস্যায় ভুগছিলেন তিনি। জীবনের শেষ দুই বছর অধিকাংশ সময় বাড়িতেই কাটাতে হয়েছে। তবুও সাংবাদিকতার নেশা থেকে নিজেকে দূরে রাখতে পারেননি।

 

শনিবার বিকেল থেকে শারীরিক অসুস্থতা আরও বেড়ে যায়। রাতে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে বড় ছেলের সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলেন তিনি। কলকাতায় থাকা ছেলেকে বাড়িতে আসার জন্য আহ্বান জানান। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই অপেক্ষা আর পূর্ণ হল না। রবিবার ভোররাত সাড়ে ৩টা নাগাদ নিজের বাড়িতেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন বাবুল হক।

 

২০০১ সালে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন তিনি। বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান বাবুল হক তাঁদের দু’জনকেই পরবর্তীতে হারান। মৃত্যুকালে স্ত্রী সেলিনা হক এবং চার সন্তানকে রেখে গেলেন।

 

বড় মেয়ে রিয়া হক (২৪) আলিয়া ইউনিভার্সিটি থেকে ম্যাথমেটিক্সে অনার্স করার পর কম্পিউটার অ্যাপ্লিকেশন নিয়ে মাস্টার্স করেছেন। ছেলে আরিয়ান হক (২২) কলকাতা থেকে প্যারামেডিকেল নিয়ে পড়াশোনা করছেন। মেয়ে মুসকান হক (২০) মালদা ওমেন্স কলেজে ইংরেজি অনার্স নিয়ে পড়াশোনা করছেন। ছোট ছেলে বাদশা হক (১৮) বর্তমানে দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র।

 

রবিবার সুজাপুরের হাতিমারি মাঠের পাশে চাষপাড়া সমাজের কবরস্থানে বাবুল হকের কাফন-দাফনের ব্যবস্থা করা হয়।

 

‘রূপান্তরের পথে’ থেকে শুরু করে ‘বসুমতী’, ‘জেলা বিচিত্রা’, ‘মালদহের সমাচার’, ‘গৌড় মালদা সংবাদ’, ‘অনবদ্য সংবাদ’ হয়ে সংবাদ প্রতিদিনের স্টাফ রিপোর্টার—বাবুল হকের সাংবাদিকতা জীবন ছিল মফস্বল সাংবাদিকতার এক দীর্ঘ, সংগ্রামী ও বর্ণময় অধ্যায়।

 

প্রতিষ্ঠান বদলেছে, সময় বদলেছে, সংবাদমাধ্যমের ধরন বদলেছে—কিন্তু খবরের প্রতি তাঁর ভালোবাসা বদলায়নি। অসুস্থতা তাঁকে ঘরে আটকে রাখলেও সাংবাদিকতার নেশা থেকে দূরে রাখতে পারেনি।

 

মালদার সাংবাদিকতা জগতে বাবুল হক শুধু একজন সাংবাদিক ছিলেন না, ছিলেন একটি সময়ের সাক্ষী, এক প্রজন্মের সহযাত্রী এবং মফস্বল সাংবাদিকতার মাঠের একজন নিরলস কর্মী। তাঁর কলম থেমে গেল, থেমে গেল দীর্ঘ সাংবাদিকতার পথচলা। কিন্তু তাঁর লেখা খবর, তাঁর মাঠের অভিজ্ঞতা এবং সহকর্মীদের স্মৃতিতে বাবুল হক বেঁচে থাকবেন দীর্ঘদিন।

 

তাঁর প্রয়াণে মালদার সাংবাদিকতা জগতে যে শূন্যতা তৈরি হল, তা সহজে পূরণ হওয়ার নয়।