পশ্চিমবঙ্গ দিবস, গৌরব, গ্লানি ও আমরা
খগেন্দ্রনাথ অধিকারী
পুষ্পপ্রভাত পত্রিকা
প্রকাশিত : ০৭:২২ এএম, ২১ জুন ২০২৬ রোববার | আপডেট: ০৭:২২ এএম, ২১ জুন ২০২৬ রোববার
পশ্চিমবঙ্গ দিবস, গৌরব, গ্লানি ও আমরা
খগেন্দ্রনাথ অধিকারী
_____________________
গ্লানির না গৌরবের,সে নিয়ে কোন মন্তব্য করবো না। মন্তব্য করবেন, সিদ্ধান্ত কোরবেন দেশবাসী, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যবাসী। ঢাকঢোল বাজিয়ে, একটি মহল থেকে ২০শে জুন "পশ্চিমবঙ্গ দিবস "পালনের আয়োজন চলছে এবং সেই সঙ্গে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় এর নাম জড়িয়ে তাঁর গুনগান চলছে
যুক্তিহীন ভাবে, অনৈতিহাসিকভাব।
দেখা যাক বাস্তবটা কি। পরাধীনতার যুগে অবিভক্ত বাংলার সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সংগ্রামের দৃঢ়তা দেখে মুগ্ধ
গোখলে বলেছিলেন "What Bengal thinks today, India thinks tomorrow."তাঁর এই বক্তব্যের সারবত্তা ছিল এই যে বাংলা আজ যে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সংগ্রামের দৃঢ়তা দেখাচ্ছে, কাল তার অনুপ্রেরণায় গোটা ভারত সেই পথে এগিয়ে যাবে।
দূরদর্শী গোখলের এই কথাটার তাৎপর্য ব্রিটিশ শাসকরা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছিল এখানে সংগঠিত ধারাবাহিকভাবে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সংগ্রামের উত্তাপে।ফারাজী আন্দোলন, ওয়াহাবী আন্দোলন থেকে শুরু করে ছৌ বিদ্রোহ, সাঁওতাল বিদ্রোহ, নীল বিদ্রোহ, স্বদেশী আন্দোলন, বিপ্লবী সন্ত্রাসবাদী আন্দোলন (ঐতিহাসিক অমলেশ ত্রিপাঠীর ভাষায় Extremist Challenge) সবকিছুরই সূত্রপাত এই বাংলার মাটিতে। কাজেই, ব্রিটিশরাজের আয়ুষ্কাল বাড়ানোর জন্য ইংরেজ শাসকরা বাংলার এই সংগ্রামী মেজাজের যে উৎস, তার অনুসন্ধান করে এবং সেটা করে তারা উপলব্ধি করে যে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বন্ধন হোল বাংলার মানুষের ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সংগ্রামের দৃঢ়তার মূল উৎস।তাই তারা বাংলার মাটিতে, সিরাজদ্দৌলা, মীর মদন, মোহনলাল, তিতুমীর, বিবেকানন্দ,বিপিন চন্দ্র পাল, অরবিন্দ ঘোষ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর,এস ওয়াজেদ আলী,
কাজী নজরুল ইসলামের জন্মভুমি বাংলার মাটিতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির মেরুদন্ডকে ভেঙ্গে দেবার পরিকল্পনা নেয়। এই উদ্দেশ্যে তারা সাম্প্রদায়িকতার দৃষ্টিকোণে ১৯০৫ সালে লর্ড কার্জনের আমলে হিন্দু প্রাধান্যাধীন অবিভক্ত বাংলার পশ্চিম দিকের জেলাগুলিকে নিয়ে, কোলকাতাকে রাজধানী করে পশ্চিম বাংলা এবং মুসলিম অধ্যুষিত পূর্বদিকের
জেলা গুলিকে নিয়ে, ঢাকাকে রাজধানী করে পূর্ব বাংলা গঠন করে। এই হোল
আমাদের দেশের মাটিতে আধুনিক কালে সাম্প্রদায়িক বিভাজন সৃষ্টির প্রথম অপপ্রয়াস।
এরপর ইংরেজদের চক্রান্তে চরমপন্থী জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের অন্যতম পীঠস্থান মহারাষ্ট্রের নাগপুরে ১৯২৫ সালে হিন্দু মৌলবাদী সংগঠন আর এস এস প্রতিষ্ঠিত হয়। ইংরেজদের মদতে অবিভক্ত বাংলা ও অবিভক্ত ভারতের সর্বত্র মুসলিম লীগ ও আর এস এস এর শাখা প্রশাখা প্রসারিত হয়।
ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ শুধু মাত্র ধর্মগত বিভাজন সৃষ্টি করেই ক্ষান্ত হয়নি।তারা বর্ণগত বিভাজনের পথ ও গ্রহণ করে। আমাদের দেশের শতশত বছরের যে সামাজিক ঐক্য,তাতে ফাটল ধরাতে তারা কিছু লোককে আসরে নামায় ।ধনী দরিদ্র নির্বিশেষে কেবল জাতিগত ভিত্তিতে সকল তথাকথিত অনুন্নত সম্প্রদায়ের মানুষদের বিশেষ সংরক্ষণের
দাবি তুলে এবং তথাকথিত উচ্চ বর্ণের মানুষেরকে এর থেকে বঞ্চিত করার দাবি জানান দিয়ে। উল্লেখ্য যে জ্যোতি রাও ফুলে, সাবিত্রী বাই ফুলে,ফতেমা শেখেরা বর্ণগত শোষণের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সাথে সাথে সবার জন্য যে সমতার দাবি করেন, আম্বেদকর -যোগেন মণ্ডলেরা তার বিরুদ্ধে যান। কংগ্রেসের গান্ধীজি,আজাদ, রাধাকৃষ্ণান,এবং কমিউনিস্ট নেতা পি সি যোশী, সোমনাথ লাহিড়ীরা আম্বেদকরের জাতপাত বাদী সংরক্ষণ,ও জিন্নার ধর্ম ভিত্তিক সংরক্ষণ ,
উভয়কেই সর্বনাশা এবং জাতীয় ঐক্যের বিরোধী বলে অভিহিত করেন। গান্ধীজি বলেন সবার কল্যাণ বা সর্বোদয়ের কথা। কমিউনিস্টরা বলেন অর্থনৈতিক ভিত্তিক সংরক্ষণের কথা । এই দুই দলের প্রচার জিন্না ও আম্বেদকরের রাজনীতিকে কোণঠাসা করে ফেলে। অবিভক্ত বাংলায় জাতপাত বাদী যোগেন মণ্ডলের অবস্থাও সঙ্গীন হয়ে ওঠে। দিশেহারা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ মরীয়া হয়ে উঠে সুপরিকল্পিত ভাবে ১৯৪৬সালে Great Calcutta Killing ঘটায় এইটা প্রমাণ করতে যে অবিভক্ত ভারতে বা অবিভক্ত বাংলায় হিন্দু মুসলিম সহ অবস্থান সম্ভব নয়,দেশ ভাগ এবং বাংলা ভাগ অনিবার্য।
বলা বাহুল্য যে এই দাঙ্গা মোকাবেলা করতে কমিউনিস্ট নেতা সোমনাথ লাহিড়ী ও কমরেড আব্দুল হালিমের নেতৃত্বে কোলকাতার ট্রাম শ্রমিকরা ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেন। গান্ধীজি বেলেঘাটা, বরিশাল, নোয়াখালী, সর্বত্র শান্তি ও সম্প্রীতির বার্তা নিয়ে ছোটেন।
প্রকাশ থাকে যে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের অবসানের পরবর্তী পরিস্থিতিতে ব্রিটেন তার বেহাল জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির চাপে ভারত ছেড়ে চলে যেতে উদগ্রীব হয়ে ওঠে। তবু তার শেষ চেষ্টা থাকে ছেড়ে চলে যাবার আগে যতখানি সম্ভব তার সাম্রাজ্যবাদী আখের গুছিয়ে নেওয়া যায়। তার লক্ষ্য ছিল যে কোন মূল্যে ভারত ভাগ, বাংলা ভাগ। তাহলে এদেশ ছেড়ে চলে গেলেও তার বাণিজ্যিক স্বার্থ অক্ষুণ্ন থাকবে।
তার গোয়েন্দা সংস্থা থেকে সে বুঝে ছিল যে কমিউনিস্ট পার্টির নেতাদের কে এবং জাতীয় কংগ্রেসের মধ্যে গান্ধীজি, আজাদ, গিরি, রাধাকৃষ্ণান, জাকির হোসেন প্রমুখ কিছু নেতাকে দেশভাগের বিষয়ে রাজী করানো যাবে না।তাই সর্বভারতীয় স্তরে তারা কংগ্রেসের মধ্যে হিন্দু ঘেঁষা এবং আর অযথা কালক্ষেপ না করে নির্বিবাদে ক্ষমতায় যেতে ও ক্ষমতা ভাগাভাগির পক্ষপাতী কিছু নেতাকে মগজধোলাই করে যে দেশ ভাগ হলে মুষ্টিমেয় কিছু মুসলিম লোক পাকিস্তান নিয়ে তুষ্ট থাকবে,আর অবশিষ্ট ভারতকে তারা
শান্তিতে শাসন করবে। বাংলার ক্ষেত্রে তারা অনুরূপ কৌশল অবলম্বন করে। এখানে বসে রাখি, রাজনীতির হিসেব গণিতে হয়না, সেটা হয় রসায়ন মেনে।১৯৪৬ সালে অবিভক্ত বাংলার বিধান সভায় কমিউনিস্টদের বিধায়ক ছিলেন মাত্র তিন জন।কমরেড জ্যোতি বসু রতনলাল ব্রাহ্মণ ও রূপনারায়ণ রায়।আর হিন্দু মহাসভার মাত্র একজন বিধায়ক। তিনি ছিলেন শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। শ্যামাপ্রসাদের লক্ষ্য ছিল বাংলা ভাগ হোক। তাঁর কাছে বড়ো ছিল মানবতা অপেক্ষাHindu Elite দের স্বার্থের প্রশ্ন, কারণ তিনি ছিলেন এই গোষ্ঠীর ই একজন। তিনি মুন্সী প্রেম চাঁদের দুঃখী, কিম্বা বঙ্কিমচন্দ্রের রামধন পোদ,রামাকৈবর্ত্য, অথবা তারাশঙ্করের অগ্রদানী পূণ্য চক্রবর্তী দের মতো হিন্দুদের প্রতিনিধি ছিলেন না।আর বঙ্কিমচন্দ্রের হাসিম শেখ, কিম্বা শরৎ চন্দ্রের গফুর মিঞা,আমিনাদের প্রতিনিধি তো নন ই।
কাজেই অবিভক্ত বাংলার হিন্দু এলিটদের স্বার্থে তিনি তো বাংলা বিভাগ চাইবেন ই। কারণ পশ্চিমবঙ্গ তৈরী হলে সেখানে Muslim Elite দের প্রতিযোগিতা থাকবে না। সাধারণ গরীব হিন্দু মুসলিম বৌদ্ধ খ্রিস্টান নির্বিশেষে খেটে খাওয়া মানুষদের উপায় কি হবে,সে নিয়ে মাথা ঘামানোর প্রয়োজন তিনি অনূভব করেননি।
অন্যদিকে অবিভক্ত বাংলার মুসলিম এলিটরাও চাইছিলেন বাংলা ভাগ, কারণ তাহলে হিন্দু এলিটদের সঙ্গে প্রতিযোগিতার ঝক্কি পোহাতে হয় না।
আর ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ তো চাইছিলোই বঙ্গবিভাগ তথা ভারত বিভাগ। শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় এই সুযোগটাই নিয়ে ছিলেন হিন্দু সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিকোণে। তাঁর সঙ্গী ছিলেন হিন্দু মহাসভার আর এক সর্বভারতীয় স্তরের
বাঙালি নেতা নির্মল চন্দ্র চ্যাটার্জি (ভারতের লোকসভার প্রাক্তন স্পীকার সোমনাথ চট্টোপাধ্যায় এর বাবা)। তবে সেই সময় ১৯৪৬ সালে হিন্দু মহাসভার একমাত্র বিধায়ক ছিলেন শ্যামাপ্রসাদ এবং সেই সুবাদে সেই পদটিকে ব্যবহার করে হিন্দু মৌলবাদী দৃষ্টিকোণে তিনি বঙ্গবিভাজন ও ভারত বিভাজনে বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। একদিকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের আশীর্বাদ ছিল ই তাঁর মাথার উপরে, অন্যদিকে জাতীয় কংগ্রেসের অনেক বিধায়ককে তিনি মুসলিম মৌলবাদীদের কার্যক্রমের রসায়নে প্রভাবিত করেছিলেন বঙ্গবিভাজন প্রস্তাব পাশের ক্ষেত্রে।
এই বিভাজনের ফলে হিন্দু মুসলিম নির্বিশেষে সাধারণ মানুষের কোন উপকার ই হয়নি। সর্বনাশ হয়েছে তাদের। উপকার হয়েছে পশ্চিমবঙ্গের এলিট হিন্দুদের (কারণ মুসলিম এলিটরা দেশভাগের জন্য সংখ্যায় কমে যাওয়ায় তাদের প্রতিযোগীর সংখ্যা কমেছে)। ঠিক একই ভাবে ও একই কারণে পূর্ব বাংলার(অধুনা বাংলাদেশের) মুসলিম এলিটরা উপকৃত হয়েছে ও হচ্ছে।কি পশ্চিমবঙ্গের কি অধুনা বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের,কি হিন্দু,কি মুসলিমের, কারোর কোন উপকার হয়নি।তাই তথাকথিত পশ্চিমবঙ্গ দিবস পালনের কর্মসূচিকে ঘিরে তাদের কোন উল্লাস নেই, আছে বাস্তহারা হওয়ার গ্লানি ও যন্ত্রণা।
এই যন্ত্রণা থেকে মুক্তি আমাদের পেতেই হবে।১৯৪৭সালে যখন ভারত ও পাকিস্তান সৃষ্টি হয়, তখন সীমান্ত গান্ধী খান আব্দুল গফুর খান ও সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রধান কমরেড যোসেফ স্টালিন বলেছিলেন যে এশিয়ার এই অঞ্চলে শান্তি ও সমৃদ্ধির জন্য উক্ত দেশ দুটিকে নিয়ে একটি Confederation বা ঢিলেঢালা আধা যুক্তরাষ্ট্র গঠন করা হোক।আজ এই উপমহাদেশে ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ,এই তিনটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র রয়েছে। সবাইকে নিয়ে, সবার সার্বভৌম সত্তাকে সম্মান জানিয়ে একটি Confederation গঠনের আন্দোলনের প্রস্তুতি ও প্রয়াস হোক,এই উপমহাদেশের মানুষদের আর্থ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কল্যাণের জন্য এই টাই সময়ের দাবি।
*লেখকের নিজস্ব মতামত*
